ওঙ্কার ডেস্ক : প্রায় এক শতাব্দী পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বুয়েনোস আইরেসে দাঁড়িয়ে বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এক্স হ্যান্ডেলে বলেন, “বুয়েনোস এয়ারেসে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। গুরুদেব ১৯২৪ সালে আর্জেন্টিনা সফর করেছিলেন এবং তাঁর এই সফর, বহু মানুষ, বিশেষত শিক্ষাবিদ ও ছাত্রছাত্রীদের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল”। এক শতাব্দী আগে এই শহরের বুকেই জন্ম হয়েছিল কবিগুরুর ‘পুরবী’, আর তার সাথে জড়িয়ে থাকা পুরানো কিছু স্মৃতি আর প্রেম।
১৯২৪ সালের ৬ নভেম্বর। ভারত থেকে পেরু যাওয়ার পথে সমুদ্রযাত্রা, তখনই হঠাৎ ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়ে দক্ষিণ আমেরিকার বুকে, আর্জেন্টিনার বুয়েনোস আইরেসে থামতে বাধ্য হলেন ৬৩ বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কে জানত, সেই ‘আকস্মিক বিরতি’ই হয়ে উঠবে তাঁর জীবনের এক অনন্য অধ্যায় যেখানে কাব্য আর দূরদেশি হৃদয়ের বন্ধন মিলেমিশে তৈরি করবে এক গল্প ! অসুস্থ কবিকে সেবাযত্নের জন্য সেখানকার প্লাজা হোটেলে তোলা হয়েছিল। সেখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর যিনি ইতিমধ্যেই কালজয়ী ‘গীতাঞ্জলি’-র অনুবাদ পড়ে রবীন্দ্রনাথে বিভোর। তখন ভিক্টোরিয়া এক উঠতি কবি ও বুদ্ধিজীবী, বয়সে অনেক ছোট। রবীন্দ্র-ভাবনা, গান, কবিতার ভিতর দিয়ে তাঁর মনে জন্ম নিয়েছিল এক অদ্ভুত মমত্ববোধ যা রূপ নিয়েছিল প্রেম-আবেগের।

ভিক্টোরিয়া রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজের শান্ত, নির্জন দেশবাড়ি ‘মিরালোরিও’। কবির সেবা ও সঙ্গেই কাটিয়ে দিয়েছিলেন টানা ৫৮ দিন। সেই দেশবাড়ির নির্জন প্রকৃতিতে, প্রবাসে, রোগ-যন্ত্রণার মাঝেও রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টি করেছিলেন প্রেম, বিষাদ আর ভিক্টোরিয়ার জন্য উৎসর্গ করা অমর কবিতা যা পরে ‘পুরবী’ কাব্যগ্রন্থ হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। ভিক্টোরিয়াকে তিনি ডাকতেন ‘বিজয়া’ নামে যার ছায়া ছড়িয়ে আছে অনেক কবিতায়, চিঠিতে, স্মৃতিকথায়। দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৩০ সালে প্যারিসে তাঁদের আবার দেখা হয়েছিল। ভিক্টোরিয়ার অনুরোধেই রবীন্দ্রনাথ প্রথমবার তুলেছিলেন তুলি। তাঁর আঁকা ছবির প্যারিস প্রদর্শনীতে তুমুল প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
বর্তমানে বুয়েনোস আইরেসে সেই স্মৃতি টিকে আছে ‘ভিলা ওকাম্পো’ হয়ে ভিক্টোরিয়ার পিতৃগৃহ, যা ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট। তবে ‘মিরালোরিও’ আর নেই ভেঙে গিয়েছে নগরায়নের চাপে। তবুও রবীন্দ্রনাথ-ভিক্টোরিয়ার সেই অনির্বাণ বন্ধন যেন এখনও বয়ে যায় ভাষার সীমা পেরিয়ে, মহাদেশের সীমানা পেরিয়ে।
