ওঙ্কার ডেস্ক : বর্তমান বিশ্ব বাণিজ্যের চালচিত্রে শুল্ক আর নিষেধাজ্ঞা এক নতুন অস্ত্র। বর্তমানে এটি হয়ে উঠেছে নিয়মিত হাতিয়ার। আর সেজন্যই বিশ্বের মানচিত্রে “Trade War” নামে এক নতুন যুদ্ধ রীতি ঢুকে পড়েছে। আর এই যুদ্ধে অবধারিত ভাবে এগিয়ে আমেরিকা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নানাভাবে শত্রু মিত্র বিশেষ প্রয়োগ করে চলেছেন তাঁর শুল্ক-অস্ত্র। ট্রাম্প প্রশাসনের মুখে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ শ্লোগান যতটা সরল শোনায়, তার ভিতর লুকিয়ে থাকে শুল্ক আর করের কড়া ছুরি, যা প্রতিপক্ষের গলায় বসিয়ে রাখা হয় অনায়াসে। আর এ বার সেই ছুরির মুখে পড়ল ‘ব্রিক্স’।
ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক ‘ব্রিক্স’ সম্মেলনে এক দিকে যেমন ভারত, চিন, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিল এই পাঁচ রাষ্ট্রের নেতারা এক মঞ্চে এসে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ‘অন্যায় শুল্কনীতির’ বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন, তেমনই শীর্ষ নেতৃত্বের ভাষণে ছিল স্বাধীন বাণিজ্যের পক্ষে স্পষ্ট বার্তা। যৌথ বিবৃতিতে সরাসরি আমেরিকার নাম না থাকলেও শুল্ক-বানিজ্যের হুমকি আর নিষেধাজ্ঞার রাজনীতির বিরুদ্ধে ব্রিক্স-এর স্পষ্ট অবস্থানই ট্রাম্প প্রশাসনের চক্ষুশূল হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। তবে বিষয়টি শুধু বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ট্রাম্পও পাল্টা নিজের স্টাইলে হুঁশিয়ারি দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, তাঁর আমেরিকা কোনও ‘শুল্কবিরোধী গোষ্ঠী’ মানবে না। বরং ‘ব্রিক্স’-এর নীতির সঙ্গে যদি কোনও দেশ যুক্ত হয়, তবে তাদের পণ্য আমদানিতে সরাসরি ১০ শতাংশ বাড়তি শুল্ক চাপানো হবে। এই হুমকি ট্রাম্পের মুখে নতুন নয়, কিন্তু এই মুহূর্তে ভারতের অবস্থানকে বেশ জটিল করে তুলেছে। চিনের সঙ্গে আগে থেকেই শুল্ক চুক্তি সেরে রাখা ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের কাছ থেকেও সুবিধাজনক চুক্তি চাইছে। এই অবস্থায় মোদী কোন পথে হাঁটবেন সেদিকে নজর।
এ দিকে ট্রাম্পের শুল্কের হুমকিতে সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছে চিন। বেজিং জানিয়ে দিয়েছে, শুল্কের মতো বাণিজ্য অস্ত্র ব্যবহার করে অন্য দেশের উপর চাপ তৈরি করা মেনে নেওয়া যায় না। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, বাণিজ্য যুদ্ধের নতুন পর্বে শুল্ক শুধু অর্থনৈতিক লড়াই নয় এটি জিওপলিটিক্সের অংশ। দক্ষিণ আফ্রিকা, যে দেশটি খোলাখুলি জানিয়ে দিয়েছে তারা আমেরিকাবিরোধী নয়, তারাও চায় শুল্ক নিয়ে তিক্ততা এড়িয়ে স্বার্থ রক্ষা করতে। অর্থাৎ শুল্ক আজ রাজনৈতিক সম্পর্কের কাঠামোতে নতুন কূটনৈতিক জটিলতা তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে এই প্রশ্নটা এখন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, শুল্ক কি একুশ শতকের বিশ্বায়নের সবচেয়ে বড় প্রতিশোধমূলক অস্ত্র ? আর এই অস্ত্রের লড়াইয়ে ভারত বা ‘ব্রিক্স’-এর মতো গোষ্ঠীর অবস্থান ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে ? এক দিকে ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রাসী শুল্কনীতি, অন্য দিকে ‘ব্রিক্স’-এর সমন্বিত ‘ফ্রি ট্রেড’-এর পক্ষে অবস্থার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা সহজ নয়। চিন, রাশিয়া নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। দক্ষিণ আফ্রিকাও জানিয়ে দিয়েছে, তারা আমেরিকাকে বিরোধী ভাবতে নারাজ।
ভারতের ক্ষেত্রে জটিলতা আরও গভীর। কারণ ভারতের স্বার্থ জড়িয়ে বিশ্ববাণিজ্যের অজস্র ছায়াযুদ্ধে বিশেষত যেখানে প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা আর বিনিয়োগ সব এক সুতোর মালা।এখন দেখার, ভারত এই শুল্ক-সন্ত্রাসের হুমকির মুখে কীভাবে নিজের অবস্থান ধরে রাখে। ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি কতটা বাস্তবায়িত হয়, আর বাণিজ্য নীতি নিয়ে ‘ব্রিক্স আর ওয়াশিংটন-এর এই দড়ি টানাটানিতে শেষ পর্যন্ত কার পক্ষে যায় লাভের পাল্লা। শুল্কের ছুরি দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ছেদ করার এই রাজনীতি একদিন আদৌ কারও উপকারে আসবে কি না সে প্রশ্ন হয়তো উত্তর দেবে সময়ই। তবে এখনই স্পষ্ট, শুল্ক আর কর নতুন বিশ্ব রাজনীতি অর্থনীতিকে টানছে নতুন এক অচেনা অনিশ্চয়তার দিকে।
