ওঙ্কার ডেস্ক: ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই নিহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাশ্মীর উপত্যকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এই ঘটনাকে ঘিরে উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ বিক্ষোভ শুরু হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রশাসন কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
জম্মু ও কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি মেহবুবা মুফতি এ বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্যের শাসক দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের নীরবতার সমালোচনা করেন। এক সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বলেন, গত পাঁচ থেকে ছয় দিন ধরে আমেরিকা ও ইসরায়েল ইরানে লাগাতার বোমাবর্ষণ চালাচ্ছে এবং সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই নিহত হয়েছেন। তাঁর মতে, একসময় ভারত ইরানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল এবং যখন ভারতের উপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল তখন ইরান দেশটিকে বিনামূল্যে তেল সরবরাহ করেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতের বর্তমান নীরবতা অত্যন্ত হতাশাজনক।
মেহবুবা মুফতি অভিযোগ করেন, কেন্দ্র সরকার ও জম্মু-কাশ্মীরের ন্যাশনাল কনফারেন্স সরকার ইরানের উপর আমেরিকা ও ইসরায়েলের হামলার বিরুদ্ধে কোনও প্রতিবাদ জানায়নি। অথচ যারা ইরানের প্রতি সংহতি জানাতে রাস্তায় নেমেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, শ্রীনগরের শালতেং এলাকার কয়েকজন তরুণীকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, এমন পরিস্থিতি দেশের জন্য উদ্বেগজনক। একই সঙ্গে তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অভিযোগও তোলেন।
মুসলিম দেশগুলির ভূমিকাকেও কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন মেহবুবা। তাঁর মতে, বহু মুসলিম দেশ এই ঘটনার ক্ষেত্রে নীরব দর্শকের ভূমিকা নিয়েছে এবং কেউ কেউ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দিয়ে পরোক্ষে সমর্থন দিচ্ছে। তিনি মনে করেন, সম্প্রতি আমেরিকা ও সৌদি আরবের মধ্যে যে চুক্তি হয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে লক্ষ্য করে কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করা।
এছাড়া ন্যাশনাল কনফারেন্সের সাংসদ আগা সাঈদ রুহুল্লাহ মেহদি এবং শ্রীনগরের প্রাক্তন মেয়র জুনায়েদ আজিম মাট্টুর বিরুদ্ধে যে মামলা দায়ের করা হয়েছে, সেটিকেও তিনি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে দাবি করেন। সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর বা উস্কানিমূলক তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছে। মেহবুবা মুফতি এই সমস্ত মামলা প্রত্যাহার এবং গ্রেফতার হওয়া সকলকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে তিনি মানুষকে আইন নিজের হাতে না নেওয়ার আহ্বান জানান এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পক্ষে মত দেন। সাংবাদিক বৈঠকে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর পোস্টার পুড়িয়েও প্রতিবাদ জানান।
অন্যদিকে ইরানে হামলা এবং খামেনেইয়ের মৃত্যুর প্রতিবাদে কাশ্মীরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর প্রশাসন উপত্যকা জুড়ে কড়া বিধিনিষেধ জারি করে। বৃহস্পতিবারও সেই বিধিনিষেধ বহাল ছিল, যদিও পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে শ্রীনগরসহ উপত্যকার বিভিন্ন জেলায় পুলিশ ও সিআরপিএফ মোতায়েন করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়কে ব্যারিকেড এবং কাঁটাতারের বেড়া বসিয়ে চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
বিশেষ করে শ্রীনগর এবং আশপাশের শিয়া অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে বিধিনিষেধ আরও কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়েছে। তবে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ায় শহরের আপটাউন এলাকায় মানুষ ধীরে ধীরে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে শুরু করেছে। শ্রীনগরের অধিকাংশ এলাকায় দোকানপাটও ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করেছে, যদিও শহরের কেন্দ্রস্থল লালচকে এখনও কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রয়েছে।
এদিকে বিভিন্ন জেলার বাজারগুলিতেও ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতা ফিরতে শুরু করেছে। সরকারি ও বেসরকারি অফিসে কর্মীরা কাজে যোগ দিতে শুরু করেছেন, যদিও পুরনো শহরাঞ্চলে চলাচল এখনও সীমিত। তবে স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে এবং ৭ মার্চের পর সেগুলি খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয়, ক্লাস্টার বিশ্ববিদ্যালয় এবং সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয় ৭ মার্চ পর্যন্ত নির্ধারিত সমস্ত পরীক্ষা স্থগিত করেছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উপরেও আংশিক বিধিনিষেধ বজায় রাখা হয়েছে। ইন্টারনেট পরিষেবা ২জি গতিতে চালু রাখা হলেও প্রিপেইড মোবাইল পরিষেবা আপাতত বন্ধ রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে উস্কানিমূলক বা আপত্তিকর পোস্টের অভিযোগে কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে প্রশাসন।
এই পরিস্থিতির মধ্যে জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা শ্রীনগরে বিভিন্ন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ধর্মীয়, সামাজিক ও ব্যবসায়িক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় তিনি শান্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনায় নিহতদের জন্য প্রার্থনাও করেন। তিনি মানুষের আবেগকে সম্মান জানিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশ করার আহ্বান জানান এবং উপত্যকায় শান্তি ও ঐক্যের পরিবেশ বজায় রাখার ওপর জোর দেন।
