নিজস্ব সংবাদদাতা : ব্রিগেডের জনসভায় দাঁড়িয়ে শুরুটা বাংলায় করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রর মোদী। বলেন, “আমার প্রিয় বাংলাবাসী। আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে প্রণাম।” তারপরই জনসমাবেশের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতা জানান। বলেন, ‘‘অদ্ভুত দৃশ্য। যেখানেই চোখ পড়ছে, সেখানেই মানুষ। এটা ঐতিহাসিক ব্রিগেড।’’ মোদী বলেন, “এত জন সমাবেশ। কেই দেখতে চাইলে দেখুন বাংলার মানুষ কী চাইছে। ব্রিগেড সাক্ষী এই ময়দান মানুষের কণ্ঠ হয়ে ওঠে। এখান থেকেই ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল দেশ।” আজ এখান থেকেই নতুন বিপ্লবের নতুন বিইগুল বাজবে। নির্মম সরকারের সমাপ্তি হবে। তাঁর কথায়, ”মহা জঙ্গলরাজ শেষ হবে, বাংলার নির্মম সরকারের অন্ত হবেই!” ব্রিগেডের সভামঞ্চ থেকে এভাবেই তৃণমূল সরকারকে নিশানা করলেন নরেন্দ্র মোদীর।
তবে ভোট পূর্ব বাংলায় আগের তিনটি জনসভার সঙ্গে এই চতুর্থ সভার বিশেষ কোনো পার্থক্য মিললো না। এবারের দলীয় কৌশল অনুযায়ী ব্যক্তি আক্রমণেও যাননি। কার্যত পুরোনো অস্ত্রে পুনরায় শান দিলেন এই যা। তিনি বলেন, বিজেপিকে আটকানোর জন্য তৃণমূল সব হাতিয়ার ব্যবহার করে ফেলেছে। রাস্তা বন্ধ করিয়েছে, পোস্টার ছিঁড়েছে, ভয় দেখিয়েছে। কিন্তু এত মানুষকে আটকাতে পারেনি তাঁরা। একে আগামী ভোটের কাউন্ট ডাউন হিসেবে দেখচক্সহেন মোদী। বললেন, “বাংলায় আবার আইনের শাসন হবে। বেছে বেছে হিসাব নেওয়া হবে।” তিনি আরও বলেন, “আপনারা জানেন বাংলার তরুণরা প্রতিভা সম্পন্ন, পরিশ্রমী। বাণিজ্যে বাংলা সবার আগে ছিল। কিন্তু আজ এখানে তরুণদের চাকরি নেই। কাজের জন্য অন্য রাজ্যে যেতে হচ্ছে। প্রথমে কংগ্রেস তারপর কমিউনিস্ট তারপর তৃণমূল। এরা লুটেপুটে খেয়েছে। নিজের পকেট ভর্তি করেছে। কারখানা বন্ধ হয়েছে। চাকরি বিক্রি হচ্ছে নিয়োগ দুর্নীতি হচ্ছে। আপনাদের স্বপ্নপূরণ মোদির গ্যারান্টি। কাটমানি না পেলে তৃণমূল নেতারা গরীবদের কোনও প্রকল্প দেয় না।”
মোদী বলেন, তৃণমূল সরকারের শুধু টাকা চাই। কাটমানি না পেলে কোনও কেন্দ্রীয় প্রকল্প চালু হতে দেয় না। তাই বাংলায় উন্নয়নের কাজ থমকে রয়েছে। কিন্তু আপনাদের স্বপ্ন পূরণ করার দায়িত্ব আমার। এটা মোদী গ্যারান্টি। তাঁর ভাষণে উঠে এলো প্রাজ্যের বিগত কংগ্রেস ও বাম সরকারের প্রসঙ্গ। তিনি বলেন, প্রথমে কংগ্রেস, তারপর বাম এবং এখন তৃণমূল সরকার, এরা একে একে এসে নিজেদের পকেট ভরেছে। রাজ্যের উন্নয়নের কাজ হয়নি। এবার সময় এসেছে বাংলার হাল বদলের। একসময় এই বাংলা সকলের আগে ছিল। সময় এসেছে সেই দিন ফিরিয়ে আনার।
মোদী বলেন, নিজেদের চেয়ার যেতে দেখে এখানকার সরকার ঘাবড়ে গেছে। তাই বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের আটকানোর বহু চেষ্টা করেছে। কিন্তু পারেনি। মনে রাখবেন, তৃণমূল আপনাদের আটকাতে পারবে না। যারা অত্যাচার করবে, তাদের ছাড়া হবে না। বেছে বেছে হিসেব নেওয়া হবে। তিনি বলেন, বাংলায় এখন আমাদের সরকার নেই। তবু বিজেপির কেন্দ্রীয় সরকারের সাহায্যে বাংলায় বিকাশের কাজ করে চলেছে। এখনই আমি ১৮ হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করলাম। বাংলার বিকাশ হবে সৎ নীতি নিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর দাবি, নতুন বাংলা গড়বেন তাঁরা। তিনি বলেন, বাংলা একটা সময় ব্যবসা-বাণিজ্যে দেশে সবচেয়ে আগে ছিল। কিন্তু এখানকার তৃণমূল সরকার রাজ্যের মানুষকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। বাংলার যুবসমাজ পরিশ্রম করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে থাকে। তাঁদের সর্বনাশ করেছে এই তৃণমূল সরকার।
তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে তিনি চাকরি বিক্রির অভিযোগ আনেন। তিনি বলেন, “এখানকার নির্মম সরকার যুবক-যুবতীদের পালিয়ে যাওয়ার অভিশাপ দিয়েছে। বাংলার যুবসমাজ মেহনতি। একসময় এই বাংলা সকলের আগে ছিল। আজ এখানকার যুবক-যুবতী না এখান থেকে ডিগ্রি পাচ্ছেন, না চাকরি। তাঁদের ভিন্রাজ্যে চলে যেতে হচ্ছে। প্রথমে কংগ্রেস, তার পর বাম এবং তৃণমূল… এরা একে একে এসেছে। নিজেদের পকেট ভরেছে। উন্নয়নের কাজ পড়ে থেকেছে। তৃণমূল সরকার প্রকাশ্যে চাকরি বিক্রি করেছে। এ বার সময় এসেছে এই হাল বদলের। বাংলায় যুবক-যুবতীরা এ বার বাংলায় কাজ পাবেন। এই স্বপ্ন পূরণের গ্যারান্টি মোদীর। তৃণমূল না নিজে কাজ করে, না অন্যদের কাজ করতে দেয়। কাটমানি না পেলে কোনও প্রকল্পকে গ্রামেগঞ্জে পৌঁছোতে দেয় না। তাই কেন্দ্রীয় প্রকল্পকে পৌঁছোতে দেয় না। ’’
দুর্নীতি ইস্যুতে তৃণমূলকে নিশানা করেন মোদীর। তিনি অভিযোগ করেন, চা-বাগানের শ্রমিকদেরও কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা দিতে দেয় না তৃণমূল। পাকা বাড়ি সর্বত্র পাচ্ছেন মানুষ। কিন্তু এখানে প্রকল্পের নাম বদলে দেওয়া হয়েছে। তার পরেও যাঁদের বাড়ি পাওয়ার কথা ছিল, তাঁরা বঞ্চিত হয়েছেন। জলজীবন মিশন থেকে আয়ুষ্মান ভারত, বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্প থেকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তৃণমূলের জন্য বঞ্চিত বলে অভিযোগ মোদীর।
তিনি বলেন, অপরাধ হলেই দেখা যায় কোনও না কোনও তৃণমূল নেতা বা কর্মী যুক্ত থাকেন। সন্দেশখালি থেকে আরজি কর কাণ্ড, মানুষ ভোলেনি। সকলেই সাক্ষী যে, তৃণমূল কীভাবে প্রকাশ্যে অপরাধীদের সঙ্গে থাকে। তাই সন্ধে নামার আগে মেয়েদের বাড়ি ফিরে আসার কথা বলতে হয়। বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই পরিস্থিতির বদল ঘটবেই।
তৃণমূলের বিরুদ্ধে তিনি বাংলার জনবিন্যাস বদলে দেওয়ার অভিযোগ আনেন। বলেন, বাঙালি হিন্দুদের সংখ্যালঘু করে দেওয়া হচ্ছে। ওরা হিন্দুদের নিজের ভোট ব্যাঙ্ক মনে করে না। বাংলাকে এখন অসুরক্ষিত বানিয়ে ফেলেছে। কোটি কোটি বাঙালিকে শেষ করার চেষ্টা করছে তৃণমূল।
সম্প্রতি রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে যে বিতর্ক চলছে তার প্রসঙ্গ টেনে এনে মোদী বলেন, জনজাতি রাষ্ট্রপতির সম্মান সহ্য হচ্ছে না তৃণমূল সরকারের। রাজ্যে মহিলা রাষ্ট্রপতি এসেছিলেন, কিন্তু অহংকারে ডুবে থাকা সরকার শুধু অনুষ্ঠানই বয়কট করেনি, রাষ্ট্রপতিকে অপমান পর্যন্ত করেছে। তৃণমূলের মনে রাখার দরকার ওরা শুধু রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে অপমান করেনি, ওরা দেশের সংবিধান, বাবা সাহেব আম্বেদকর, দেশের হাজার লক্ষ জনজাতি মানুষের অপমান করেছে।
ব্রিগেডসভায় দাঁড়িয়ে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, “আমি তৃণমূলকে বলছি তাঁদের গুন্ডারাজ এবার শেষ হতে চলেছে। তৃণমূলের সরকার চলে যাওয়ার কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হবে। অপরাধীদের জায়গা হবে জেল। একদিকে সকলের বিকাশ হবে, অন্যদিকে সবার হিসেব নেওয়া হবে।
সবশেষে তিনি স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন, এ বারের ভোট সরকার বদলের নয়, বাংলার আত্মাকে বাঁচানোর। তিনি বলেন, ‘‘কেউ কেউ ভয় দেখানোর চেষ্টা করবেন, কেউ কেউ বলবেন বদল সম্ভব নয়। কিন্তু মনে রাখুন মানুষ যখন ঠিক করে নেন, তখন ঠেকানোর কেউ থাকে না। বাংলার মানুষ যখনই ঠিক করে নেন, তখন ইতিহাস বদলে যায়। আজ ব্রিগেড দেখে সেই আত্মবিশ্বাস পাচ্ছি। তিনি বলেন, “দার্জিলিং থেকে সুন্দরবন, চা বাগান থেকে কলকাতার গোলি সর্বত্রই বদলের আওয়াজ উঠেছে। এ বারের ভোট সরকার বদলের নয়, বাংলার আত্মাকে বাঁচানোর। ব্যবস্থা বদলের নির্বাচন, কাটমানি থেকে, ভয় থেকে মুক্তির নির্বাচন।” এ প্রসঙ্গে তিনি রবীন্দ্রনাথকে টেনে আনেন। বলেন, “বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা– / বিপদে আমি না যেন করি ভয়……
ব্রিগেডে জনসভায় যোগ দেওয়ার আগে সরকারি অনুষ্ঠান থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি বলেন, “আজ কলকাতার মাটি থেকে পশ্চিমবঙ্গ ও দেশের উন্নয়নের নতুন অধ্যায় লেখা হবে। ১৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে আজ। আমি বাংলা ও দেশের মানুষকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। সড়ক, রেল এসব নিয়ে নতুন নতুন প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ তৈরি করবে। বাংলা ভারতকে পথ দেখিয়েছে, আবারও বিকশিত বাংলা হয়ে দেশকে পথ দেখাবে।”
