স্পোর্টস রিপোর্টার : সঞ্জু ফের দেখিয়ে দিলে ক্রিকেট কতটা আনপ্রেডিক্টেবল। কখন যে রঙ বদলাবে তা আগে থেকে হিসেব কষে বলা মুশকিল। খেলা শেষে ইডেনের ড্রেসিং রুমে যে ভাবে তিনি ব্যাটে চুম্বন করলেন তাতে বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না এই ম্যাচ তাঁর কাছে স্বপ্নের মতো হয়ে রইল। তিনি নিজেও বললেন, এটা তাঁর কাছে অন্যতম মনে রাখার মতো দিন। যেভাবে পাথরের মতো জমে ছিল উত্তেজনার পাথর খেলা শেষে তা যেন গলে পড়ল তাঁর বডি ল্যাঙ্গুয়েজে।
কয়েক দিন আগে যাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল বেঞ্চে বসেই বিশ্বকাপ কাটাবেন, এদিন তিনিই হলেন জয়ের কান্ডারী। শুধু তাই নয়, তাঁর ব্যাটে ভর করে এক চূড়ান্ত অনিশ্চয়তার মধ্যে তিনি দলকে পোঁছে দিলেন সেমিফাইনালে। এদিন ৫ উইকেটে জয় এনে দেওয়ার পথে তাঁর অপরাজিত ৯৭ টি ২০ ক্রিকেট বিশ্বে একটা মাইলস্টোন হয়ে রইল।
পরের দৃশ্যে দেখা গেল হার্দিক পাণ্ড্য থেকে শুরু করে অক্ষর পটেল, অভিষেক শর্মা এবং সব শেষে অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব সঞ্জুকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। আরও এক বার বোঝা গেল সঞ্জুর বুকের পাথরটা কত বড় ছিল। ৩ রানের জন্য সেঞ্চুরি পেলেন না বটে, তবু তাঁকে দেখে মনে হল এতে কোনো আক্ষেপ নেই। ইডেনের হিরো যেন অব্যর্থ অস্ত্রে ধ্বংস করলেন সমস্ত অবজ্ঞা।
টস জিতে ফিল্ডিং-এর সিদ্ধান্ত নেন অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওপেনাররা প্রথমে সাবধানে ব্যাটিং করলেও, পাওয়ার প্লেতে ধীরে ধীরে রানের গতি বাড়াতে শুরু করেন। রস্টন চেজ ও শিমরন হেটমায়ার জুটি বেশ শক্তপোক্ত হয়ে ওঠে। রানও গতিশীল ছিল। তবে হেটমায়ারকে মাত্র ১২ বলে ২৭ রানে আউট করে দেন জসপ্রীত বুমরাহ। পরের দুই উইকেটে আরও চাপ সৃষ্টি করে ভারতের বোলাররা। শেষ পর্যন্ত ৪ উইকেটে ১৯৫ রান তোলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। রভম্যান পাওয়েল (৩৪) ও জেসন হোল্ডার (৩৭*) অপরাজিত থাকলেও, ভারতের ফিল্ডিং ও বোলিংয়ে দুর্বলতায় বাড়তি রান তুলে নেন তাঁরা।
ব্যাট হাতে ভারতের শুরুটা ভালো ছিল না। ওপেনার অভিষেক শর্মা এবং ঈশান কিশন সুবিধা করতে পারলেন না। সূর্যকুমারেরও ব্যাট হাতে ছন্দ পাচ্ছিলেন না। সেসময় নিজের কাঁধে দায়িত্ব তুলে নেন সঞ্জু স্যামসন। পাওয়ার প্লের পরও সাবলীল ব্যাটিং চালিয়ে ২৬ বলে হাফ সেঞ্চুরি করেন। বিশ্বকাপের আগে নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি সিরিজ়ে রান পাচ্ছিলেন না তিনি। বিশ্বকাপের শুরুতে তাঁর উপর ভরসা রাখতে পারেননি গৌতম গম্ভীরেরা। অভিষেকের অফ ফর্ম সঞ্জুকে ফের নিয়ে আসে লড়াইতে।
প্রত্যাশা রাখলেন সঞ্জু। নিজেকে উজাড় করে দিলেন বিশ্বকাপের ‘কোয়ার্টার ফাইনালে’। এদিন ইডেনে ছিল ‘ডু অর ডায়’ ম্যাচ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ়ের কাছে হারলেই বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যেতে হত ভারতকে। তা হতে দিলেন না সঞ্জু। ২২ গজের একটি দিক ধরে থাকলেন। কোনো হঠকারিতার পথে যাননি তিনি। নিজের সেঞ্চুরির কথাও ভাবেননি। তাঁর ব্যাটিং দেখে মনে হচ্ছিল, ব্যক্তিগত নয়, দলের স্বার্থই বড়। জেতার পরও সংযত উচ্ছ্বাস সঞ্জুকে অনেক পরিনত করে তুলেছিল।
ম্যাচের সেরা ক্রিকেটারের পুরস্কার নেওয়ার পর সঞ্জু বললেন, ‘‘দীর্ঘ দিন ধরে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট খেলছি। ১০-১২ বছর ধরে আইপিএল খেলছি। দেশের হয়েও প্রায় ১০ বছর খেলছি। বিরাট কোহলি, মহেন্দ্র সিংহ ধোনিদের কাছে অনেক কিছু শিখেছি। সেটা আমাকে সাহায্য করেছে। অভিজ্ঞতা বাড়িয়েছে। ওরা কী ভাবে খেলত, পরিস্থিতি অনুযায়ী কী ভাবে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করত সেগুলো দেখেছি।’’
রবিবার ইডেনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে সুপার এইটের ম্যাচে জয়লাভের পর ভারতের অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব দলের চরিত্র এবং সংযমের প্রশংসা করেছেন। অধিনায়ক বলেন, “অবশ্যই, এটি একটি দুর্দান্ত অনুভূতি, এবং আমরা যেভাবে খেলেছি, আমি মনে করি, যেমনটি সবাই বলেছে, এটি একটি কোয়ার্টার ফাইনালের মতো ম্যাচ ছিল,ছেলেরা যেভাবে চরিত্র দেখিয়েছে, আমি মনে করি এটি একটি দুর্দান্ত অনুভূতি দিল।”
স্যামসনের স্থিতিস্থাপকতা এবং অধ্যবসায়ের প্রশংসা করেছেন অধিনায়ক সূর্যকুমার। তিনি বলেছেন, “আমি সবসময় বলি, যারা অপেক্ষা করে, যাদের অনেক ধৈর্য থাকে তাদের সঙ্গে ভালো কিছু ঘটে। আমি এখনই তার সঙ্গে দেখা করার সময় এটি বলেছিলাম। কিন্তু তারপর এটি তার কঠোর পরিশ্রম, যখন সে খেলছিল না তখন দরজার পিছনে সে কী করছিল, এবং সে নিখুঁত পর্যায়ে তার ফল পেয়েছে। এবং যেভাবে সে ব্যাট করেছে, তা দলকে পুরোপুরি জয়ের দিকে নিয়ে গেছে,” তিনি বলেন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজকে বেঁধে রাখার জন্য বোলারদের কৃতিত্ব দিয়েছেন সূর্যকুমার। একই সঙ্গে তাড়া করার সময় অংশীদারিত্বের গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “আমি মনে করি সবাই পরিকল্পনা অনুসারে বোলিং করেছে। আমরা জানতাম ইডেনে শিশির পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং দ্বিতীয় ইনিংসে উইকেট যেভাবে পরিণত হয়, ২০০ রান তাড়া করার জন্য সবসময় একটি ভাল স্কোর। বলটি ব্যাটে সুন্দরভাবে আসে। এবং ব্যাটসম্যানরা পরে ছোট ছোট পার্টনারশীপের মাধ্যমে যেভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল, আমার মনে হয় এটিই ছিল খেলাটিকে গভীরভাবে নিয়ে যাওয়ার মূল চাবিকাঠি।”
মুম্বাইয়ে সেমিফাইনালে ভারত এখন ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে সূর্যকুমার বলেছেন, “ওই জায়গায় থাকতে পেরে খুব খুশি। প্রথম খেলা থেকেই আমরা যেভাবে খেলেছি, আমার মনে হয় সেমিফাইনাল পর্যন্ত আমরা ওই জায়গাটা পাওয়ার যোগ্য ছিলাম। সেটাও মুম্বাইতে, কিন্তু আমরা এখনই এটা নিয়ে ভাবছি না। বিশ্রাম নাও, আরাম করো, আগামীকাল একটা বিমান ধরো। মুম্বাই পৌঁছানোর পর, আমরা এটা নিয়ে ভাবতে শুরু করব।”
বড় ম্যাচের পরিস্থিতির আবেগগত গুরুত্ব স্বীকার করে তিনি আরও বলেন যে চাপ অভিজাত খেলার একটি অন্তর্নিহিত অংশ। তাঁর কথায়, “অবশ্যই, আমি একমত। কোন চাপ নেই, কোন মজা নেই। এবং আমরা এই সত্য থেকে পালাতে পারি না যে কোন চাপ নেই। চাপ আছে, আমরা সেখানে নার্ভাস। পেটে প্রজাপতি আছে। কিন্তু তারপর, আমরা ভারতে খেলছি, হোম টিম হোম ভেন্যুতে খেলছে। চাপ থাকবে, কিন্তু তারপর আপনি কীভাবে এটি বোঝেন, আপনি কীভাবে এটি গ্রহণ করেন, এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।”
ভারত এখন সেমিফাইনালের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময় এই গতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে, ধৈর্য, বিশ্বাস এবং সময়োপযোগী ব্যক্তিগত প্রতিভার উপর ভিত্তি করে একটি সংজ্ঞায়িত জয়ের পর আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পাবে। তারা ৫ মার্চ নকআউট সংঘর্ষে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলবে।
রবিবারের ইনিংস নিয়ে বললেন, ‘‘আগের দিন আমরা আগে ব্যাট করেছিলাম। বড় রান তোলার লক্ষ্য ছিল। প্রথম থেকেই মারতে হয়েছিল। ও রকম ভাবে খেলতে হলে আউট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ দিন তেমন ছিল না। জানতাম, কত রান করতে হবে। সেই মতো খেলার চেষ্টা করেছি। একটা একটা করে বল নিয়ে ভেবেছি। বলের মান বুঝে খেলার চেষ্টা করেছি। আমার মনে হচ্ছে না বিশেষ কিছু করেছি। তবে এটা আমার জীবনের অন্যতম সেরা দিন।’’
