মৌসুমী পাল
প্রকৃতির কাছে মানুষ আজও অসহায়। ভূমিকম্প, বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় সভ্যতা। কিন্তু আফগানিস্তানের মতো দেশে প্রকৃতির চেয়ে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে ধর্মের নাম করে চাপিয়ে দেওয়া অমানবিক আইন। ভূমিকম্পে ভেঙে পড়া ঘরবাড়ির নিচে চাপা পড়ে অসংখ্য নারী যখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন, তখন তালিবান শাসিত আফগানিস্তান অটল থেকেছে শরিয়তের ‘শুদ্ধতায়’। মানবজীবনের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে ধর্মীয় নিষেধ।
শরিয়ত আইনের কঠোর ব্যাখ্যায় নারীর শরীরে পরপুরুষের স্পর্শ হারাম। এই নিয়মের জেরেই ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা অসংখ্য নারীকে উদ্ধার করা হয়নি। বেঁচে থাকার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁরা মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন কেবলমাত্র “ধর্মের শুদ্ধতা” রক্ষার নামে। নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন বলছে, নারী-অধিকার কেড়ে নেওয়ার কারণে উদ্ধারকারী দলে কোনও মহিলা সদস্যই নেই। ফলে যাঁরা ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়েছিলেন, তাঁদের শরীরে হাত দেওয়া হয়নি। অনেকে আহত হয়েও দিনের পর দিন পড়ে থেকেছেন বিনা চিকিৎসায়। যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের দেহ কাপড় দিয়ে জড়িয়ে টেনে তোলা হয়েছে যেন তাঁরা মানুষ নন, কেবল এক বোঝা।
কুনার প্রদেশের এক বেঁচে যাওয়া মহিলা জানিয়েছেন, উদ্ধারকারীরা তাঁদের এক জায়গায় জড়ো করে রেখেছে, কিন্তু কোনও সাহায্য করেনি। অন্যদিকে স্বেচ্ছাসেবী সদস্য তাহজিবুল্লা মাহজিবও স্পষ্ট করেছেন, “নারীরা উদ্ধারকারীদের কাছে অস্পৃশ্য। গুরুতর আহত হয়েও তাঁরা কোনও চিকিৎসা পাচ্ছেন না। উদ্ধারকারীরা কেবল পুরুষ ও শিশুদের নিয়ে ব্যস্ত।” নারীদের শরীর ছোঁয়া এড়াতে তাঁদের কাপড় ধরে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, এই ছবি একবিংশ শতকের সভ্য পৃথিবীর চোখে লজ্জাজনক।
আফগানিস্তানে তালিবান শাসনের সময় থেকেই নারীরা মৌলিক অধিকার হারিয়েছিল। শিক্ষার সুযোগ, কাজের সুযোগ, চলাফেরার স্বাধীনতা সবই ধীরে ধীরে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার সময় তালিবান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল মানবিক হবে, নারীর অধিকার রক্ষা করবে। বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি আজ কেবল প্রতারণা। তালিবানের নিয়ম অনুযায়ী ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিষিদ্ধ, পুরুষ অভিভাবক ছাড়া ঘর থেকে বেরোনো দায়, চাকরিক্ষেত্রে নারীকে অদৃশ্য করে দেওয়া হয়েছে। আর এখন দেখা যাচ্ছে, দুর্যোগের সময় প্রাণ বাঁচানোর অধিকার থেকেও তাঁদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।
আফগানিস্তানে ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ছাড়িয়েছে ২২০০। আহতের সংখ্যা ৩৬০০-এর বেশি। ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে আছে আরও অনেকে। কিন্তু উদ্ধার অভিযান চলছে শরিয়তের বিধি মেনে অর্থাৎ নারীদের জীবনকে গৌণ করে রেখে। আফগানিস্তান আজ মৃত্যুর এক কারাগারে বন্দি নারী সমাজের জন্য।
এই চিত্র শুধু হৃদয়বিদারকই নয়, সভ্যতার মুখে এক অমোচনীয় কলঙ্ক। মানবিকতার মূল দর্শনই যেখানে জীবন রক্ষা, সেখানে ধর্মীয় ব্যাখ্যা যদি বাঁচার সুযোগ কেড়ে নেয়, তবে তা কেবল নির্মমতা নয়, এক ভয়াবহ অমানবিকতা। প্রশ্ন উঠছে মানবতার মূল্য কি ধর্মীয় ব্যাখ্যার কাছে এতটাই তুচ্ছ ? মানুষের প্রাণ কি এতই সস্তা ? দুর্যোগের সময়ে ধর্ম নয়, মানবিকতাই সর্বোচ্চ হওয়া উচিত। কারণ প্রকৃতির কাছে সবাই সমান পুরুষ, নারী, শিশু, বৃদ্ধ। যখন সে তার ধ্বংস তান্ডব চালায় তখন সে ভেদাভেদ করে না নারী-পরুষের, ধর্ম-অধর্মের। অথচ তালিবান শাসনে নারী এখনো ‘অস্পৃশ্য’, এখনো দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। আজকের আফগানিস্তানের চিত্র এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। ভূমিকম্প কেবল ঘরবাড়ি ভাঙেনি, উন্মোচন করেছে রাষ্ট্রীয় অমানবিকতার নির্মম চেহারাও।
