নয়ন বিশ্বাস রকি
উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হামে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ৪৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রায় ৫০ হাজার শিশু আক্রান্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী, এই মারাত্মক প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা নির্দেশিকা ও দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন। এক সময় টিকাদান কর্মসূচির সফলতার কারণে নিয়ন্ত্রণে থাকা এই রোগ এখন নতুন করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল- বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিন বাড়ছে হাম আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক পরিবার এখনও হামকে সাধারণ জ্বর বা ভাইরাল রোগ ভেবে অবহেলা করছে। ফলে চিকিৎসা নিতে দেরি হচ্ছে, আর সেই দেরিই অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
হাম পরিস্থিতি আজ যে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তার পেছনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্বহীনতা ও অব্যবস্থাপনাই বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে। সময়মতো টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা এবং স্বাস্থ্যখাতে জরুরি নজরদারি নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল সরকারের। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, চরম উদাসীনতা। মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সংকট, টিকার ঘাটতি এবং সচেতনতা কার্যক্রমের দুর্বলতার কারণে হাজার হাজার শিশু ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে আক্রান্ত শিশুদের ভিড় বাড়লেও জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়নি। ফলে প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে শিশু মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। এটি শুধু অবহেলা নয়, এক ধরনের প্রশাসনিক ব্যর্থতা।
প্রশ্ন হলো, কেন সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? কেন টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি পূরণ করা গেল না? শিশুদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ কর্মকর্তাদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কারণ একটি শিশুর মৃত্যুও কোনোভাবেই অবহেলার শিকার হতে পারে না। দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও কঠোর শাস্তিই পারে ভবিষ্যতে এমন ট্রাজেডি রোধ করতে।
হাম কোনো সাধারণ রোগ নয়। এটি অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে খুব দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য এটি ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা হাম আক্রান্ত হলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট কিংবা মস্তিষ্কের জটিলতায় আক্রান্ত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, টিকার আওতা কমে গেলে হাম দ্রুত মহামারির আকার ধারণ করতে পারে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে টিকাদান কর্মসূচিতে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রশংসিত একটি দেশ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে টিকা গ্রহণে অনীহা, সচেতনতার অভাব এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বল নজরদারির কারণে নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। করোনা মহামারির সময় বহু শিশুর নিয়মিত টিকা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল। তার প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
গ্রামের অনেক এলাকায় এখনও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত পৌঁছাতে পারেন না। আবার শহরের বস্তি এলাকাগুলোতেও বহু শিশু টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অভিভাবকদের অনেকেই জানেন না, হাম প্রতিরোধে সময়মতো দুটি ডোজ টিকা অত্যন্ত জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিকা নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। কিছু মানুষ গুজবে বিশ্বাস করে শিশুদের টিকা দিতে ভয় পাচ্ছেন। অথচ একটি টিকাই পারে একটি শিশুর জীবন রক্ষা করতে।
দেশের হাসপাতালগুলোতে হাম আক্রান্ত শিশুদের ভিড় বাড়ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, আক্রান্তদের বড় একটি অংশ টিকা না নেওয়া শিশু। অনেক শিশুকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আনা হচ্ছে।কারও উচ্চ জ্বর, কারও শরীরে ফুসকুড়ি, কারও শ্বাসকষ্ট। হাসপাতালের শয্যা সংকটও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
এখানে সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু টিকাদান কর্মসূচি ঘোষণা করলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। কোন এলাকায় কত শিশু টিকার বাইরে আছে, কোথায় সংক্রমণ বাড়ছে, কোথায় স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট- এসব তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করে ব্যবস্থা নিতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা ও মহানগর পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত তৎপরতা জরুরি।
স্কুলভিত্তিক স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। শিশুদের অভিভাবকদের নিয়মিত জানাতে হবে হাম কতটা ভয়ংকর হতে পারে। মসজিদ, মন্দির, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বাড়াতে হবে। টেলিভিশন, রেডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গণসচেতনতামূলক প্রচারণা বাড়ানো দরকার। মানুষকে বুঝতে হবে- হাম প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো টিকা।
স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়ানোর কথাও নতুন করে ভাবতে হবে। অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষা কিংবা শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে দ্রুত রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। তাই সরকারের উচিত হাম মোকাবিলায় বিশেষ জরুরি পরিকল্পনা গ্রহণ করা। একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো সমাজের ক্ষতি। অথচ এই মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য। সামান্য সচেতনতা, সময়মতো টিকা এবং কার্যকর সরকারি নজরদারির মাধ্যমে অসংখ্য শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু যদি অবহেলা চলতেই থাকে, তাহলে হামের এই মৃত্যু মিছিল আরও দীর্ঘ হবে।
বাংলাদেশ অতীতে বহু স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করেছে। পোলিও নির্মূল থেকে শুরু করে শিশুমৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে দেশ বিশ্বে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে হাম প্রতিরোধেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জবাবদিহি এবং সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ।
আজ সময় এসেছে নতুন করে সতর্ক হওয়ার। একটি শিশুও যেন টিকার বাইরে না থাকে, একটি পরিবারও যেন অজ্ঞতার কারণে সন্তান হারায় না- এই লক্ষ্য নিয়েই সরকার ও সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। হামের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব নয়, এটি পুরো জাতির দায়িত্ব। এখনই যদি কঠোর নজরদারি ও কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে আগামী দিনে এই সংকট আরও বড় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।