নিজস্ব সংবাদদাতা, বজবজ : ১২৯ বছর আগে বিশ্ববিজয় করে স্বামী বিবেকানন্দ দেশে ফিরেছিলেন ১৮৯৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। সেই ঐতিহাসিক দিনে বজবজে প্রথম পদার্পণ করেছিলেন স্বামীজী। সেই দিনকে উদযাপন করতে গত ৪০ বছর ধরে বজবজ স্টেশন থেকে স্পেশাল ট্রেন ছাড়ে। বৃহস্পতিবার স্বামীজীর প্রতিকৃতি মূর্তি নিয়ে ৯-৫৫ মিনিটে সুসজ্জিত ট্রেন ছাড়ল শিয়ালদহের উদ্দেশ্যে। তার আগে একঘণ্টার স্বামীজির প্রত্যাবর্তনের অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হল বজবজ স্টেশনে। এর আগের দিন ১৮ই ফেব্রুয়ারি বুধবার বিকেলে বিবেক ম্যারাথন আয়োজন করল বজবজ বিবেক সংহতি।
গত ৪০ বছর ধরে স্বামীজির প্রত্যাবর্তন উদযাপন হয় বজবজ স্টেশনে। বৃহস্পতিবার সকালে স্বামীজীর মূর্তি নিয়ে ঘোড়ার গাড়ির রথ এসে পৌছয় বজবজ স্টেশনে। সেই মূর্তি সুসজ্জিত ট্রেনে নিয়ে যাওয়া হল শিয়ালদহ হয়ে আলমবাজার মঠে। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের সম্পাদক স্বামী শাস্ত্রজ্ঞানন্দ, নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক স্বামী ইষ্টেশানন্দ, বজবজ পুরসভার চেয়ারম্যান গৌতম দাশগুপ্ত, বজবজ স্টেশন ম্যানেজার ভি কে সিরকা, বজবজ বিবেকানন্দ স্মারক কমিটির সভাপতি শুভময় ঘোষ ও সম্পাদক স্মৃতিরঞ্জন ঘোষ।
১৮ই ফেব্রুয়ারি বুধবার বিকেলে বিবেক ম্যারাথন আয়োজন করল বজবজ বিবেক সংহতি। প্রায় ৩০০ শিশু-কৈশোর স্বামীজীর পদধূলি পূণ্য স্থান বজবজ পুরাতন স্টেশন থেকে বজবজ নতুন স্টেশন পর্যন্ত প্রতীকী ম্যারথানে অংশগ্রহণ করে।

প্রসঙ্গত, স্বামী বিবেকানন্দ চিকাগো ধর্মমহাসভায় বক্তব্য রেখে ১৮৯৭ সালে ১৯ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিজয় করে বাংলার মাটিতে প্রথম বজবজের মাটিতে পদার্পণ করেছিলেন। মাদ্রাজ থেকে মোম্বাসা জাহাজে করে প্রায় ২০ জন দেশি-বিদেশি সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসীনিদের সঙ্গে নিয়ে স্বামী বিবেকান্দ নামেন বজবজের মাটিতে। ১৮ই ফেব্রুয়ারি বিকেলে কোনও অজানা কারণে স্বামীজির জাহাজটি বজবজের জেটিতে থমকে যায়। সারারাত সেই জাহাজে কাটিয়ে পরদিন ১৯ ফেব্রুয়ারি সূর্য উঠার পরই তৎকালীন বজবজ স্টেশনে আসেন। সেখানে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ট্রেনে চেপে রওনা দেন শিয়ালদহের উদ্দেশ্যে। তারপর শিয়ালদহে প্রায় ২০ হাজার ভক্তের কাঁধে চেপে পৌঁছলেন আলমবাজার মঠ। সেই স্মরণে আজ ১৯ ফেব্রুয়ারি বুধবার বেলুড় মঠ ও পূর্ব রেলের সহযোগিতায় বিবেকানন্দ স্পেশাল ট্রেন আসবে বজবজ থেকে শিয়ালদহে।
তৎকালীন বজবজ স্টেশন এখন ইয়ার্ড মাস্টারের অফিসে পরিণত হয়েছে। ঐ জায়গাটি এখন পুরাতন স্টেশন নামে খ্যাত। ঝোপ-ঝাড়-জঙ্গলে কোনক্রমে টিকে রয়েছে স্বামীজির পদধূলি ধন্য ওই অফিস ও প্ল্যাটফর্ম। স্বামীজি স্টেশনের যে কাঠের চেয়ারটিতে বসেছিলেন সেটি পূর্ব রেলের মিউজিয়ামে সংরক্ষিত করেছেন পূর্বতন রেলমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ইয়ার্ড মাস্টারের অফিসে স্বামীজি বিশ্রাম নেওয়ার জায়গাটি বেসরকারি উদ্যোগে স্বামীজির প্রতিকৃতি বসানো হয়েছে। বর্তমান স্টেশন কোমাগাতামারু বজবজ নামে প্রায় দুই কিলোমিটার আগে স্থান পেয়েছে।

যদিও বজবজে স্বামীজির ঐতিহাসিক এই পদার্পণ সেভাবে কেউ জানতই না। সকলেই জানতেন স্বামীজি খিদিরপুর নেমেছিলেন। কিন্তু আটের দশক স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও বজবজ পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান প্রয়াত গণেশ ঘোষ নানা তথ্য ঘেঁটে প্রমাণ করেন স্বামীজি চিকাগো ধর্মমহাসভা থেকে বাংলার মাটিতে ফিরেছিলেন বজবজের মাটিতে পা দিয়ে। অবশেষে বেলুড়মঠ সেই তথ্যকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৮৬ সাল থেকে বজবজ স্টেশনে স্বামীজির ঘরের ফেরার দিন স্মরণে বিশেষ ট্রেন যাত্রার সূচনা হয়। সেই থেকে প্রতিবছর ১৯ ফেব্রুয়ারি পূর্বরেলের তরফে বিশেষ ট্রেন দেওয়া হয়। সেই ট্রেন সাজিয়ে স্বামীজির প্রতিকৃতি নিয়ে রওনা দেয় শিয়ালদহের উদ্দেশে। স্বামীজি স্পেশাল ট্রেনটির ছাড়ার আগে বজবজ স্টেশনে পুরসভা ও স্বামীজি স্মারক কমিটির উদ্যোগে বিশেষ অনুষ্ঠান আজও হয়ে আসছে। ১৮ই ফেব্রুয়ারি স্বামীজির জাহাজ থমকে গিয়েছিল। তাই সেই দিনটির স্মরণে বিগত কয়েকবছর ধরে বিবেক সংহতির উদ্যোগে আয়োজিত ‘বিবেক ম্যারাথন’। প্রায় ৩০০ শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী এই ম্যারাথনে অংশগ্রহণ করে।
