কুশল চক্রবর্তী
ডার্বি বা মোহনবাগান ম্যাচে জয়ের পর হার এটা ইস্টবেঙ্গলের নতুন নয়। শুধু তাই নয়, ইস্টবেঙ্গলের ডুরান্ড কাপের সেমিফাইনালে হার সেটাও অনেক দিন আগেই ১০ বারের বেশী ঘটে গেছে। তবে এবার যা দেখা গেল তা বাজারে চলতে থাকা কথার সাথে অদ্ভুত ভাবে মিলে গেল। ২০২১ সাল থেকে এতদিন দিল্লি আর শিমলায় অনুষ্ঠিত শতাব্দী প্রাচীন প্রতিযোগিতা ডুরান্ড
কাপ কলকাতায় অনুষ্ঠিত হবার পর থেকে আমরা অনেক বিচিত্র ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি। এবারও আরেকবার হলাম। সেমিফাইনালে যে ভাবে ইস্টবেঙ্গল ডায়মন্ড হারবার ফুটবল ক্লাবের কাছে হারল, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। ডায়মন্ড হারবারের জেতার পেছনে যদি মুল কারণ হয়ে থাকে সুযোগের সদব্যাবহার করা আর মিরশাদ মিচুর অনবদ্য গোল রক্ষণ, তবে ইস্টবেঙ্গলের পতনের কারণ হয়ত বড়লোকের বাউন্ডুলে ছেলের মত হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলা।
ইস্টবেঙ্গলের এই হারের অন্যতম কারণ হচ্ছে গোলকিপার প্রভুশুখন গিলের নিম্নমানের গোল রক্ষা। খেলার প্রথম ১৭ সেকেন্ডে আর আট মিনিটের মাথায় গিল যে দুটো ভুল করে, তা দেখেই কোচের বোঝা উচিত ছিল আজকের দিনটা হয়ত গিলের নয়। প্রথম ক্ষেত্রে রক্ষণের সাথে ভুল বোঝাবুঝিতে প্রায় গোল খাইয়ে দেওয়া আর পরের ক্ষেত্রে হাতের নীচ দিয়ে বল গলানো।
যে দুটো গোল ইস্টবেঙ্গল খেয়েছে, সে দুটোর পেছনেই গিল তার ভুল অস্বীকার করতে পারেনা। অবশ্যই দরুণ ব্যাক ভলিতে গোল করেছে ডায়মন্ড হারবারের রক্ষণ ভাগের খেলোয়াড় মিখেল কোরতাজার, কিন্তু ফুটবলে তো গোলের আট গজের মধ্যে গোলকিপার তো রাজা; কি করে অপর দলের খেলোয়াড় ওখানে বল মারার সুযোগ পায়। উচু হয়ে আশা বলে গিলের দুর্বলতা কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে মোহন বাগান ম্যাচেই বোঝা গিয়েছিল। সে যাত্রা গোল লাইন সেভ করে দলকে বাঁচিয়েছিল কেভিন সিবিলে। দ্বিতীয় গোলের ক্ষেত্রে আবার সেই ভুল। আট গজে বল ধরতে ভুল করায় বা বিপক্ষের আক্রমণ ভাগের খেলোয়াড়কে বাধা না দেবার খেসারত দলকে দিতে হয়েছে। এ বার গোল করে জবি জাস্টইন।
খেলা দেখার সময় বার বার মনে হয়েছে ইস্টবেঙ্গল এখনও মোহনবাগান ম্যাচের ক্লান্তি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। প্রথমার্ধে ইস্টবেঙ্গলের খেলা ছিল হাঁটি হাঁটি পা পা। আর ডায়মণ্ড হারবারের কোচ কিবু ভিকুনা ঠিক করেই রেখেছিল তার দল প্রতি আক্রমণ ভিত্তিক খেলা খেলবে। আর তাই দিয়েই তিনি বাজিমাত করলেন।
ইস্টবেঙ্গল দর্শক সমর্থকেরা তাঁদের প্লেয়ারদের শট বারে আর সাইড পোষ্টে লাগার জন্য হয়ত তাদের ভাগ্যকে দুষবেন। যেমন মিগুয়েলের শট ক্রশবারে, নওরেমের শট সাইড পোস্টে লাগে । কিন্তু ডিমান্তকশ আর বিপিন সিং কি তাদের সহজ সুযোগ নষ্টের দায় এড়াতে পারেন ? ইস্টবেঙ্গলের খেলার মধ্যে বার বার প্রকাশ পেয়েছে পরিকল্পনার অভাব। কিভু ভিকুনার দল তাদের যে ভাবে গোল মুখে জটলায় জড়িয়ে দিয়েছে তা ভাঙ্গতে তারা সাফল্য লাভ করেনি।
ভারতে রেফারিং নিয়ে কিছু বলতে গেলে মহাভারত রচনা হয়ে যাবে। অতএব তা নিয়ে কিছু না বলাই ভালো। আর পরজিত কোচের রেফারিং এর প্রতি কটাক্ষ এটা তো খুব পরিচিত ব্যাপার। তবু একথা বলা যেতেই পারে যে রেফারিং ম্যান উন্নতি হলে ফুটবলের উন্নতিই হয়।
আর ক্রীড়া ক্ষেত্রে রাজনীতির প্রবেশ নতুন না হলেও, যতই কম হয় ততই কাম্য। মনে রাখতে হবে রাজনীতির প্রভাবে প্রতিষ্ঠিত নানা ক্লাব ভারতীয় ফুটবলে কিছু সময়ের জন্য চমক দিতে পারে কিন্তু দীর্ঘ স্থায়ী হয়নি। মনে আছে কিছুদিন আগেও গোয়ার চার্চিল ব্রাদার্স কলকাতার অনেক ক্লাবকেই হারিয়েছিল।
১৯৮৪ সালের ফেডারেসান কাপ সেমিফাইনালে ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানকে ১-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছেছিল। কিন্তু ফাইনালে ইস্টবেঙ্গল কলকাতার আরেক দল মোহামেডান স্পোর্টিং-এর কাছে ১-০ হেরে যায়। সে খেলায় মোহামেডান স্পোর্টিং এর হয়ে গোল করেছিলেন জামশেদ নাশিরি, ইস্টবেঙ্গলের গোলরক্ষক তাপস চক্রবর্তীর হাত থেকে বল পড়ে যাবার পর। ইতিহাসের মধ্যে নিহিত থাকে অবাক সব ঘটনা।
