নিজস্ব প্রতিনিধি, পূর্ব মেদিনীপুর : স্বপ্নাদেশে বাড়ির পুকুর থেকে পাওয়া সুপারি কে ৩০০ বছর ধরে দেবী দূর্গা হিসেবে পূজা করে আসছেন ভৈরবদারি জানা পরিবার। জমিদার পরিবারের প্রাচীন এই পূজা ঘিরে রয়েছে নানা অলৌকিক কাহিনী। লোককথায় জানা যায়, প্রায় তিন শতাব্দী আগে ওড়িশার ব্যবসায়ী অঙ্কুরচরণ পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পটাশপুর থানার ভৈরবদাড়ি গ্রামের এই অঞ্চলে আসেন ধান-চালের ব্যবসা করতে। ব্যবসায়িক সাফল্য এবং এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাঁকে এতটাই আকৃষ্ট করে যে, স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। সঙ্গে আনেন তাঁর পত্নী রেনুকাবালা দেবীকে।

রেনুকাবালা ছিলেন ধর্মপরায়ণ নারী। প্রতিদিন পুকুরে চাল ধোয়ার সময় তিনি হাঁড়িতে অদ্ভুত কিছু উঠে আসছে দেখতে পেতেন, যা শামুক ভেবে ফেলে দিতেন। এভাবে কয়েকদিন যাওয়ায় এর পরেই এক রাতে তিনি দেবীর স্বপ্নাদেশ পান—“আমি তোমার পূজা পেতে চাই।” প্রথমে গরিব হওয়ায় দ্বিধাগ্রস্ত হলেও, পরপর স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি দেবীর নির্দেশ মেনে নেন। একদিন চাল ধোয়ার হাঁড়িতে সিঁদুরলাগা দুটি সুপারি আকৃতির বস্তু পান তিনি। সেটিকে কুলুঙ্গিতে রেখে দেন এবং বুঝতে পারেন এটি দেবীর প্রতীক। এবং সেই রাতে তিনি স্বপ্নাদেস পান আমি যেখানে বলবো তুই সেখানে গেলে যা পাবি তাতে আর কোন দিন তোর ব্যেবসা করতে হবে না। রাতে স্বপ্নাদেস মতো রেনুকাবালা ও অঙ্কুরচরন সেই স্থানে গেলে দেখতে পান প্রচুর ধন সম্পদ। যা দিয়ে শুরু হয় জানা পরিবারের জমিদারি।
এরপর গড়ে ওঠে মন্দির। প্রথমে নির্মিত হয় বিষ্ণুমন্দির ও দূর্গা মন্দির, পাকাবাড়ি, পরে এক সাধুর নির্দেশে যোগ হয় শিবমন্দির। দেবীকে স্থানীয়ভাবে পূজা করা হয় চণ্ডী ও মহামায়া রূপে। বিশ্বাস করা হয়, দেবীর নির্দেশেই নামকরণ হয় এই পূজার। সেই সিঁদুর লাগানো সুপারির ওপর প্রতিদিন সিঁদুর দিয়ে পুজো করতে করতে সুপারিগুলো এক একটি ১০০ কেজি ওজনের আকার ধারণ করে ও কলেবর রুপ নেয়। পেতলের কলশির উপর এই সুপারি ও সিদুর দিয়ে তৈরি কলেবর দুটিকে বসিয়ে পুজো হয় প্রতিদিন। প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো এই পূজা আজও ভক্তদের কাছে সমান শ্রদ্ধার। আট প্রজন্ম ধরে চলে আসছে পূজা-আচার।

দেবীর রূপ প্রতিভাত হয় একটি পিতলের ঘটের উপর। যেখানে প্রতিদিন ২০-২৫টি প্রদীপ জ্বালানো হয়। স্থানীয়দের দৃঢ় বিশ্বাস, মায়ের কাছে মানত করলে পূর্ণ হয় যে কোনো কামনা। বিশেষ করে দুর্গাপুজোর সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত চলে বিশেষ উৎসব। নবমীর দিনে হয় ১০ কেজি ঘি দিয়ে বিশেষ হোম। আশপাশের গ্রাম থেকেও বহু মানুষ এসে অংশ নেন এই পুজোয় । প্রাচীন নিয়ম মেনে আজও পুজোর কদিন সপ্তমী থেকে নবমী জানা পরিবারের লোকজন রাতে বেলায় ভাত রান্না করেন একই হাঁডিতে। গোটা ফল সবজি দিয়ে রান্না করে খান ।
দেবীর অলৌকিক কাহিনি আজ দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, “মায়ের আশীর্বাদেই এই অঞ্চলে শান্তি, সমৃদ্ধি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আজও অটুট।” এছাড়াও এই জমিদার পরিবারের বিষ্ণু মন্দিরে হয় রাস উৎসব, ঝুলন উৎসব, বাসন্তি পুজো, শিবচতুর্দশীও অনুষ্ঠিত হয়। এই জানা পরিবারে দূর্গা মন্দিরটি প্রচীন হওয়ার কারণে তা আজ ধ্বংসাবশেষটুকু পড়ে রয়েছে। তাই এবার এই পরিবারের পক্ষ থেকে নতুন মন্দির তৈরি করে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হল।
