
ডক্টর জাহিদ হোসাইন
বাঙালির ইতিহাসে কিছু নাম আছে- যা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে চিরন্তন হয়ে ওঠে। সেই নামগুলোর শীর্ষে অবস্থান করছেন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। যিনি আমাদের কাছে শুধু একজন নেতা নন, একটি স্বপ্ন, একটি সংগ্রাম, একটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতীক। তিনি চিরঞ্জীব, কারণ তাঁর আদর্শ, তাঁর ত্যাগ এবং তাঁর সাহস আজও বাঙালির হৃদয়ে অমলিন।
সকলের মননে স্বীকৃত বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। তাঁর জন্ম না হলে এই দেশের জন্ম এত সহজে হত না। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া এই মহান নেতা ছোটবেলা থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছিলেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল প্রতিবাদের আগুন, হৃদয়ে ছিল মানুষের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসা। তিনি কখনও অন্যায়ের সঙ্গে আপোষ করেননি, বরং বারবার কারাবরণ করে প্রমাণ করেছেন-স্বাধীনতার জন্য সবকিছু ত্যাগ করা যায়।
পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রামে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এক অবিসংবাদিত নেতা। তিনি শুধু রাজনীতির মাঠেই নেতৃত্ব দেননি, নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন বাঙালির মুক্তির জন্য। তাঁর সংগ্রাম ছিল দীর্ঘ, কঠিন এবং ত্যাগে ভরা- যার একটি বড় অংশজুড়ে আছে কারাবাসের ইতিহাস।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলেও পূর্ববাংলার মানুষ দ্রুতই বুঝতে পারে যে তারা বৈষম্যের শিকার। ভাষা, অর্থনীতি, রাজনীতি- সব ক্ষেত্রেই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের অধিকার হরণ করছিল। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন তরুণ নেতা শেখ মুজিব। তিনি যুক্ত হন ভাষা আন্দোলন-এ, যেখানে বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এবং এর ফলে প্রথমবারের মতো গ্রেফতার হন। পরবর্তীতে তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরে আওয়ামী লীগ)-এর নেতৃত্বে উঠে আসেন এবং বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলনকে সুসংগঠিত করেন।
বঙ্গবন্ধুর জেল জীবন ছিল অত্যন্ত কষ্টকর ও দুঃসহ। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে মোট ৪৬৮২ দিন কারাগারে কাটিয়েছেন। এর মধ্যে ব্রিটিশ আমলে ৭ দিন এবং বাকি ৪৬৭৫ দিন বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তান সরকারের আমলে। জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে থেকেও তিনি দমে যাননি। বরং তাঁর মনোবল আরও দৃঢ় হয়েছে। কারাগারে বসেই তিনি দেশ ও মানুষের মুক্তির পরিকল্পনা করতেন। তাঁর কাছে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার চেয়ে দেশের স্বাধীনতা ছিল বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৬৮ সালে পাকিস্তান সরকার তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ এনে শুরু করে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। এই মামলায় তাঁকে প্রধান আসামি করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করা। কিন্তু উল্টো ফল হয়- সারা দেশে গণআন্দোলন শুরু হয়। ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালে সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। সেই সময়েই তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন।
এরপরও পাকিস্তানি শাসকদের দমননীতি থেমে থাকেনি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা চালায়, যা ইতিহাসে পরিচিত অপারেশন সার্চলাইট নামে। এর পরপরই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও তিনি মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি হয়েছিলেন, কিন্তু তবুও তিনি নিজের আদর্শ থেকে একচুলও সরে আসেননি।
বঙ্গবন্ধুর এই দীর্ঘ সংগ্রাম ও কারাবাসের ইতিহাস প্রমাণ করে- তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, বরং ছিলেন এক সাহসীযোদ্ধা, যিনি বাঙালির মুক্তির জন্য নিজের জীবনকেও তুচ্ছ করেছিলেন। তাঁর জেল জীবন আমাদের শেখায়, সত্য ও ন্যায়ের পথে চলতে গেলে ত্যাগ স্বীকার করতেই হয়।
শেষ পর্যন্ত তাঁর নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের ফলেই বাঙালি জাতি অর্জন করে স্বাধীনতা। তাই বলা যায়, পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম এবং তাঁর জেল জীবন আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক ছিল ছয় দফা আন্দোলন। ১৯৬৬ সালে তিনি ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন, যা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা। এই ছয় দফা দাবি পাকিস্তানি শাসকদের কাছে ছিল এক বড় চ্যালেঞ্জ। এই আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি বাঙালির অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মুক্তির দাবি তুলে ধরেন। ছয় দফা ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ, যা পরবর্তীতে স্বাধীনতার বীজ বপন করে।
১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে, যখন পুরো দেশ স্বাধীনতার জন্য উন্মুখ, তখন বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালির মনে সাহস ও প্রেরণার সঞ্চার করে। ৭ মার্চের ভাষণ ছিল এক অনন্য ঘোষণা, যেখানে তিনি বলেছিলেন- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই ভাষণ ছিল একটি যুদ্ধের দিকনির্দেশনা, একটি জাতির জাগরণের ডাক।
তারপর শুরু হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত হয় আমাদের স্বাধীনতা। এই যুদ্ধের অনুপ্রেরণা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি তখন পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন, তাঁর আদর্শ ও নির্দেশনায় বাঙালি জাতি লড়াই চালিয়ে যায়। তাঁর নামেই যুদ্ধ হয়েছিল, তাঁর স্বপ্নেই বিজয় অর্জিত হয়েছিল।
স্বাধীনতার পর এক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নতুন রাষ্ট্র গঠনের কঠিন দায়িত্ব নেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫- এই স্বল্প সময়ে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের জন্য বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেন, যা আজও জাতি গঠনের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
১৯৭২ সালে দেশে ফিরে তিনি প্রথমেই একটি সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নেন। একই বছরের মধ্যেই প্রণীত হয় বাংলাদেশের সংবিধান, যেখানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- এই চারটি মূলনীতি রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি হিসেবে নির্ধারিত হয়। এটি ছিল একটি আধুনিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র গঠনের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা।
অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন। যুদ্ধের ফলে ধ্বংসপ্রাপ্ত শিল্পকারখানা পুনরুদ্ধার এবং উৎপাদন সচল করতে তিনি জাতীয়করণ নীতি গ্রহণ করেন। কৃষিখাতে উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের সহায়তা, বীজ ও সার সরবরাহ এবং জমির সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। একইসঙ্গে খাদ্য সংকট মোকাবিলায় সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে।
বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বিশেষ গুরুত্ব দেন। প্রাথমিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা বিস্তারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাশাপাশি গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানবসম্পদ উন্নয়ন ছাড়া একটি জাতি এগিয়ে যেতে পারে না।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করতে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে এবং বিশ্বদরবারে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তবে এই সময় ছিল নানা চ্যালেঞ্জে পরিপূর্ণ। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা—সবকিছু মোকাবিলা করেই তিনি দেশ গঠনের কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্র পরিচালনায় শৃঙ্খলা আনতে তিনি বাকশাল প্রতিষ্ঠা করেন- যা ছিল দেশ গঠনে একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তিনি চেয়েছিলেন একটি সোনার বাংলা- যেখানে থাকবে ন্যায়বিচার, সমতা ও মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে। সহজ করে বললে, সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু একটি নতুন জাতির ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হন। তাঁর দূরদর্শিতা, নেতৃত্ব ও দেশপ্রেম আজও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার প্রেরণা হয়ে আছে।
কিন্তু ইতিহাসের নির্মম পরিহাস- ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, একদল বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে নির্মমভাবে সপরিবারে নিহত হন এই মহান নেতা। ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, এটি ছিল বাঙালির স্বপ্নকে ধ্বংস করার এক ঘৃণ্য চেষ্টা। কিন্তু তারা সফল হয়নি। কারণ একজন মানুষকে হত্যা করা যায়, কিন্তু তাঁর আদর্শকে কখনো হত্যা করা যায় না।
বঙ্গবন্ধু আজ আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর চিন্তা, তাঁর দর্শন, তাঁর সংগ্রামের ইতিহাস আজও আমাদের পথ দেখায়। তিনি চিরঞ্জীব হয়ে আছেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে, প্রতিটি আন্দোলনে, প্রতিটি স্বাধীনতার চেতনায়।
আজকের বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি- সব ক্ষেত্রেই উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। কিন্তু এই উন্নয়নের পেছনে যে ভিত্তি, যে স্বপ্ন, তা গড়ে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, শোষণমুক্ত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব আজ আমাদের। নতুন প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধু শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নন, তিনি একটি প্রেরণা। তাঁর জীবনী আমাদের শেখায়- কিভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়, কিভাবে মানুষের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করতে হয়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, দেশপ্রেম মানে শুধু কথা নয়, এটি একটি দায়িত্ব, একটি কর্তব্য।
বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করেই আমরা এগিয়ে যেতে পারি একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার পথে। তাঁর দেখানো পথে চললে কোনো বাধাই আমাদের থামাতে পারবে না। কারণ তাঁর শিক্ষা আমাদের শিখিয়েছে- সংগ্রামই জীবনের মূলমন্ত্র।
আজ আমরা যখন তাঁর জন্মদিন উদযাপন করি বা তাঁর স্মৃতিকে স্মরণ করি, তখন শুধু আবেগে ভেসে গেলেই হবে না। আমাদের প্রতিজ্ঞা করতে হবে- আমরা তাঁর আদর্শ বাস্তবায়ন করব, আমরা দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলব, আমরা বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাব। যা বঙ্গবন্ধু চেয়ে ছিলেন।
আসলে বঙ্গবন্ধু কোনো নির্দিষ্ট সময়ের নেতা নন, তিনি সকল সময়ের, সকল প্রজন্মের। তাঁর আদর্শ কখনো পুরোনো হয় না, বরং প্রতিনিয়ত নতুনভাবে আমাদের অনুপ্রাণিত করে। তাই তিনি চিরঞ্জীব- তার অবস্থান আমাদের হৃদয়ে, আমাদের চেতনায়, আমাদের স্বপ্নে।
শেষপর্যন্ত বলবো, বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ, আর বাংলাদেশ মানেই বঙ্গবন্ধু। যতদিন এই দেশের মাটি থাকবে, যতদিন এই দেশের মানুষ থাকবে, ততদিন বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকবেন। তিনি আমাদের মাঝে আছেন, থাকবেন- চিরকাল, চিরঞ্জীব হয়ে।
লেখক ভার্জিনিয়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক
