অনুপ কুমার বিশ্বাস
ও গিরি,ও গিরি,
বসতে দাও সোনার পিঁড়ি।
সোনার পিঁড়িতে বসবে কে?
বাস্তু ঠাকুর এসেছে।
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। বাস্তু পূজা তেমন একটি লোকসংস্কৃতি, জনপ্রিয় লোক আঙ্গিক। বাস্তু পূজা আসলে ভূমি পূজা। হালই গান – বাস্তু পূজা -কুমির পূজা গ্রাম – গঞ্জের মানুষের অন্তরের সাংস্কৃতিক সম্পদ।পৌষ সংক্রান্তিতে গ্রামের ঘরে ঘরে পিঠে – পায়েসের সুগন্ধ যেন উৎসবের মেজাজ পাশাপশি আঙিনায় আঙিনায় আলপনায়ে ভরিয়ে দেয় বাঙালি ঘরের মেয়েটি। এইভাবে সবাই মেতে ওঠে ভূমি পূজায়। এই জনপ্রিয় বাংলার লোককৃষ্টি বাস্ত পূজা, হালই গান আজ প্রায় বিলুপ্ত।
হালোই গান ও বাস্তু পূজা যেন একই দেহের দুটি রূপ। ডক্টর সুজিত কুমার বিশ্বাস মনে করেন বাস্ত পূজার অঙ্গরূপেই হালোই গানের উদ্ভব। একথা নিঃসংশয়ে বলা যায়। অনুমিত হয় হালোই গীতি মধ্যযুগের শেষ ভাগ থেকে গীত হয়ে আসছে। এই গান পার্বণ কেন্দ্রিক কৃষি চাষির গান। পূর্ববাংলার ফরিদপুর, বরিশাল, যশোহ, খুলনা, পাবনা, রাজশাহী প্রভৃতি জেলাতেই হালোই গানের প্রচলন আছে ভীষণভাবে। এখনো পশ্চিমবাংলার উত্তর ২৪ পরগনা ও নদীয়া জেলায় লোকোগীতি হিসেবে হালোই গানের প্রাধান্য রয়েছে।
পৌষ মাসে এই হালোই গান সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পরিবেশন করে গ্রামের কিশোর-যুবকেরা। ওদের হাতে থাকে লাঠি। উঠোনে ঠুকতে থাকে তাই দিয়ে, গানের তালে তালে। এই হালোই গানের যন্ত্রানুষাঙ্গে হারমোনিয়াম, খোল, কর্তাল ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রের দেখা মেলে। এই গানের সুর ও তাল অধিকাংশ প্রচলিত এবং প্রায় একই রকমের। কিছু কিছু গান বর্তমান সময়ের হালোই শিল্পীরাও রচনা করেছেন। অপেক্ষাকৃত সেই গান সংখ্যায় অনেক কম। রাতের বেলায় গান গেয়ে গেয়ে তারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাল ও অর্থ সংগ্রহ করে; পৌষসংক্রান্তিতে জলাশয়ের কাছে মাটি দিয়ে কুমির তৈরি করে এবং তার সামনে মাটির মঞ্চ বানিয়ে তার মাঝখানে একটি জিওল গাছের ডাল পুঁতে, পুরোহিত দিয়ে এই পুজো করা হয়ে থাকে। অনেক জায়গায় খিচুড়ি প্রসাদও করে থাকে। মনে রাখতে হবে এই লোকাচার কৃষিজীবীরা অর্থাৎ অন্ত্যজ শ্রেণীর মানুষেরা করে থাকেন এবং তা একেবারেই গ্রামীণ। শহরে এর কোন ছাপ পড়েনি।

হালোই গানের নামকরণ
হালোই গানের নামকরণ নিয়ে মত দ্বৈধতা থাকার কথা নয়। যেহেতু এটি বাংলা লোকায়ত সংস্কৃতি, লোকগান এবং গ্রামীণ সংস্কৃতি। বিভিন্ন অঞ্চলে এর নামের বিভিন্নতা আছে যেমন হালোই গান, আলোই গান, আলই গান, হালুই গান, হোলোই গান, হুলুই গান ইত্যাদি। আঞ্চলিকতার কারণে এর নামকরণ এরকম হয়েছে। নামের সঙ্গে “হাল” কথাটি থাকায় তার সঙ্গে কৃষির যোগ থাকাটা স্বাভাবিক। হালোই গীত অর্থাৎ হালের গীত। “হালই” শব্দটি হাল বা লাঙল শব্দ থেকে এসেছে, ই-প্রত্যয় করে সম্পর্ক বা সম্বন্ধ।
হালোই গীতি
এই গান গুলি ছড়া ভিত্তিক এবং পৌরাণিক, ভক্তি মূলক, কৌতুক ভিত্তিক, ঐতিহাসিক, স্বদেশী আন্দোলন মূলক, ঐতিহাসিক, সামাজিক, মন্বন্তর কেন্দ্রিক ভালোই গান ও বাস্তু ঠাকুর ভিত্তিক হালোই গান ইত্যাদি। যেমন : ওরে – ভগীরথের জন্মের কথা শুনবেন দিয়া মন, ওরে -রাম রাবণের যুদ্ধের কথা শুনবেন দিয়া মন, ওরে- জোলার একটা পোলা ছিল দধি খেতে চায়, ওরে -অবিরামের হয় দ্বীপান্তর ক্ষুদিরামের ফাঁসি, ওরে- বড় ঘরের মেয়ে আমি বড় ঘরে যাব, ওরে -বাস্ত দেবের গুণের কথা শুনবেন দিয়া মন, ওরে- পঞ্চাশ সালের অভাবের কথা শুনেন দিয়া মন ইত্যাদি।
গানের শুরুতে “ওরে” কথাটি ব্যবহার করা হয় এটা এই গানের বৈশিষ্ট্য। প্রত্যেকটি গানের সুর একই রকমের, ছড়ার গানগুলি ছড়ার মেজাজে কথা বলে সুরের সঙ্গে বলা হয়। গানের কথাগুলি প্রচলিত, তবে আধুনিক কালের কিছু কিছু গীতিকার হালোই গান লিখেছেন – সংখ্যায় সেগুলি অনেক কম।

বাস্তু পূজা কি কুমির পূজা
বাস্তু পূজারী বালক কিশোর অনেক সময় বাস্তু পূজাকে বলে থাকে কুমির পূজা। আসলে ভয় থেকে ভগবানের উদ্ভব, তাই অজ্ঞাতে কুমিরকে দেবত্বে উন্নীত করা হয়ে থাকে। হিন্দু শাস্ত্রে দেখা যায় দেবদেবীর পূজা শেষে তার বিসর্জন দেওয়া হয়। কুমিরকেও সেই ভাবে হয়তো কেটে ফেলে দিয়ে তার বিসর্জন দেওয়া হয়। যুক্তি দিয়ে বলা যায় এই আচারকে কোন ভাবেই কুমির পূজা বলা যায় না। কারণ হালোই গানের বিষয় বিচারে কোথাও কুমিরের উল্লেখ নেই, তাই কুমিরকে এই আচারের মূল ভূমিকায় বসানো যায় না, এই পূজার অধি দেবতা নিঃসন্দেহে বাস্তু ঠাকুর। গীতিকাররা কোনও হালোই গানে কুমিরের ব্যবহার করেননি এ থেকে বোঝা যায় বাস্তু পূজা কোনো ভাবে কুমির পূজা নয়।

বাস্তু পূজা শেষে কুমির বলি দেওয়া হয় কেন ?
বাস্তু পূজারী বালকেরা ভাবে মাটির কুমির যদি জ্যান্ত হয়ে আক্রমণ করে, মেরে ফেলে সেই ভয়ে তাকে পুজো শেষে বলি দেওয়া হয়। রক্তের উপস্থিতি বোঝাতে আলতা ঢেলে দেওয়া হয়। আবার অনেকে ভাবে কুমির হল অশুভ শক্তির প্রতীক তাই তার বিনাশ হওয়াই ভালো।
কুমিরকে বলি প্রদানের কারণ :
পূজোর সময় কুমিরকে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করার পরে সে যদি হয়ে ওঠে হিংস্র ক্ষুধার্ত, তখন মানুষ হয়ে ওঠে তার খাদকের প্রতীক। খাদ্য – তখন আর কুমিরের ধর্ম থাকেনা। মানুষ যদি এর প্রতিরোধ করতে না পারে তাহলে মানুষ বেঁচে থাকতে পারে না। সেই জন্য কুমিরকে প্রাণ প্রতিষ্ঠার করার পরে মেরে ফেলে দেওয়া হয়।
বাস্তু পূজায় কুমিরের উপস্থিতি অপরিহার্য কেন :
১) বাস্তু ঠাকুরের বাহন হল কুমির
২) কুমির ভূমি তথা স্থল ভাগের প্রতীক
৩) কুমির সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির ধারক
৪) ভূমিক্ষয় রোধক রূপে বিবেচিত কুমির।
৫) নদীমাতৃক বাংলাদেশের মধ্য ও পূর্বাংশ, বীরভূম জেলার কিছু অংশ, মহারাষ্ট্রের সমুদ্র তীরবর্তী কিছু অঞ্চল ছাড়াও গোয়া ও আন্দামানের কিছু অঞ্চলে বাস্তু পূজার সঙ্গে পূজা কুমির প্রচলিত।

সময় স্থির থাকে না, গতিশীলতা তার ধর্ম। কাল বদলায়, সময় বদলায়। বাজারে ফজলি আম ফুরালে আসে নতুন আতাফল। লোক সংস্কৃতি পথ হাঁটছে কবে থেকে, কে জানে। নদীর সঙ্গে তার গভীর মিতালী। সাগরে মিশতে চেয়ে কতবার যে তাকে বাক নিতে হয় যে। আধুনিক সংস্কৃতির রোজ রোজ জন্ম নিতে হয়, অজস্র রূপে। তার ভিড়ে লোকসংস্কৃতি হারিয়ে যায় না কখনোই। আধুনিক সংস্কৃতি যদি হয় আমসত্ত্ব, তবে লোক সংস্কৃতি আম। মাঠে মাঠে আউল, বাউল, জারি, সারি, কবিগান, লোকগানের জনতার ঢল নামে। বাংলার গ্রাম গঞ্জের মানুষ পুরাতনকে শ্রদ্ধা জানায়। তারাই লোক সংস্কৃতির ধারক বাহক সাধক। বাংলার লোক সংস্কৃতি মাথা উঁচু করে থাকবে, সভ্যতার অন্তিম দিন পর্যন্ত।
