মৌসুমী পাল: বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে যেন নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। এর প্রেক্ষাপটে অবশ্যই পশ্চিমি দাপট। বিশেষ করে আমারিকার ‘দাদাগিরি’ এবং ‘হটকারিতা’। কারণ, যে ভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট স্বঘোষিত ‘বাণিজ্য যুদ্ধে’র ঘোষণা করলেন তাতে বিরক্ত বহু দেশ। একদিকে ভারতের উপর খাড়া রেখে যেভাবে রাশিয়াকে বেগ দিতে চাইছে আমেরিকা, তেমনি চিনের সঙ্গে চলছে দ্বিচারী কূটনীতি। তার উপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিসন্ধীমূলক শান্তি প্রক্রিয়াকেও অনেক দেশ ভালো চোখে দেখছে না। পাকিস্তান, ইজরায়েলকে দিয়ে তিনি যেমন নোবেল শান্তি পুরস্কারের হাওয়া তুলতে চাইছেন, তেমনি স্বার্থ বিঘ্নিত হলে সামরিক আগ্রাসনের হুমকি। আর এইসবকে ছাপিয়ে বিশ্ব জুড়ে ঝড় তুলেছে ট্রাম্পের স্বেচ্ছাচারী শুল্ক আরোপ।
ঠিক এমন একটা পরিস্থিতিতে তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে শাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলন। এটা যে শুধু একটা কূটনৈতিক আয়োজন, তা মনে করছে না আন্তর্জাতিক মহল। বরং এর মধ্যে তাঁরা দেখছেন বিশ্বের মেরুকরণের সম্ভাবনা। ভারত, রাশিয়া, চিন এই তিন শক্তিধর দেশ কৌশলগত কারণে একজোট হলে বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্রটাই বদলে যেতে পারে। তাহলে কি বিশ্ব রাজনীতি ভাগ হতে চলেছে পূর্ব ও পশ্চিমে?
এর মধ্যেই ভারতও ক্রমে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করছে। আগামী দিনগুলিতে চিন সফরে যাওয়ার আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ঘোষণা করেছেন, ভবিষ্যতে মস্কো-বেজিং সম্পর্ক গড়ে উঠবে রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির কৌশলগত বোঝাপড়ার উপর ভিত্তি করে। তাঁর মন্তব্য, ডলার-ইউরোর একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙতে রাশিয়া-চিন যৌথভাবে উদ্যোগী হবে। একই সঙ্গে তিনি ‘ন্যায্য বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থা’-র ডাক দিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে আমেরিকার প্রতি খোলা চ্যালেঞ্জ। ওয়াশিংটনের একক কর্তৃত্বের বিকল্প হিসেবে পুতিন যে নতুন কাঠামো গড়ে তুলতে চাইছেন, সেটিই বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অবশ্যই এর মূলে ইউক্রেন। কারণ ইউক্রেনকে ঘিরে ন্যাটো যে ভাবে পূর্ব বিশ্বে নাক গলানোর ভূমি তৈরি করতে চাইছে, তাতে রাশিয়া ভবিষ্যৎ সংকটের বীজ দেখছে।
ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সম্প্রতি স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘‘ রাজনীতিতে কেউ স্থায়ী বন্ধু নয়, কেউ স্থায়ী শত্রুও নয়। কেবল স্বার্থই স্থায়ী।’’ মার্কিন শুল্কচাপ এবং রাশিয়া থেকে তেল আমদানির প্রশ্নে ওয়াশিংটনের অস্বস্তির আবহে এই মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিরক্ষায় আত্মনির্ভরতার পথে হাঁটছে ভারত। যুদ্ধজাহাজ থেকে শুরু করে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। দেশে তৈরি সামরিক সরঞ্জামের উপরই ভরসা বাড়াচ্ছে নয়াদিল্লি। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারত এখন আর একতরফা নয়, বরং বহু দিক খোলা রেখে কৌশল সাজাচ্ছে। এসসিও সম্মেলনে মোদীর উপস্থিতি তাই নয়া সমীকরণের পথে ভারতের অঙ্গীকার হিসেবেই ব্যাখ্যা করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এই আবহে নিজের প্রতিক্রিয়া দিতে পিছিয়ে নেই চিনও। ট্রাম্প প্রশাসন যখন সব চিনা আমদানির উপর শুল্ক দ্বিগুণ করে ২০ শতাংশে তুলেছে, তখনই পাল্টা জবাব দিয়েছে বেজিং। আমেরিকার নানা পণ্যের উপর পাল্টা কর বসিয়েছে তারা। সেই সঙ্গে ফেন্টানিল নামের মাদক সংক্রান্ত অভিযোগে ট্রাম্প প্রশাসনের মন্তব্যকে ‘ব্ল্যাকমেল’ আখ্যা দিয়ে দায় সরাসরি আমেরিকার ঘাড়ে চাপিয়েছে চিন। ফলে স্পষ্ট, মার্কিন আগ্রাসী বাণিজ্যনীতির মুখে চিনও আপসের বদলে মোকাবিলার পথেই হাঁটছে।
দ্বিতীয়বার আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হওয়ার পর কেন এই শুল্কবাণ ছুড়ছেন ট্রাম্প এটা কার্যত ষ্পষ্ট। ব্রিকস্ জোট যে বিশ্ব বানিজ্য বাজারে আমেরিকার একচেটিয়া আধিপত্য ভাঙ্গতেই নিজেদের কারেন্সি চালু করেছে সেটাই হয়েছে তাঁর মাথাব্যাথার কারণ। ব্রিকস যখন নিজেদের মুদ্রা চালু করে ডলারের একচেটিয়া আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে, তখন থেকেই বাড়তে শুরু করে আমেরিকার অস্বস্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার একাধিক দেশকে পাশে টেনে ডলারকে এড়িয়ে নতুন আর্থিক কাঠামো গড়ার এই প্রচেষ্টা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা।
ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কযুদ্ধ তাই কেবল বাণিজ্য নিয়ে নয়, বরং সরাসরি ডলার-কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চালানোর প্রয়াস। ডলারের বিকল্প তৈরি হলে আমেরিকার আর্থিক প্রভাব কমে আসবে বিশ্ব বানিজ্যে, বিশ্ব অর্থনীতিতে। সেই আশঙ্কাই ট্রাম্পকে আরও আক্রমণাত্মক করে তুলেছে। ফলে ভারত-চিন-রাশিয়া ঘনিষ্ঠতার পাশাপাশি ব্রিকস মুদ্রাই বর্তমান বিশ্বরাজনীতির টানাপড়েনের মূল কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
কিন্তু এ সবের মধ্যেই সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে আমেরিকার সাধারণ মানুষের উপর। ছোট ব্যবসায়ী থেকে কৃষক সকলেই বাড়তি খরচের বোঝা বইছেন। বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা, এমনকি কর্মসংস্থানের উপরও প্রভাব পড়ছে। ফলে ট্রাম্পের শুল্কনীতি নিয়ে আমেরিকার ভেতরেই অস্বস্তি বাড়ছে। অনেকের মতে, এই পদক্ষেপ আসলে ভোক্তাদের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ক্ষতি ডেকে আনবে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের এই অযৌক্তিক শুল্ক নির্ধারন নীতিকে বেআইনি বলে ব্যাখা করেছে আমেরিকার ফেডেরাল সার্কিটের আপিল আদালত। আদালত বলেছে ট্রাম্প মাত্রাতিরিক্ত শুল্ক আরোপ কারো হিতে তো আসছেই না বরং বিশ্ব অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে ক্ষতি করছে। আপিল কোর্টের আগে শুল্ক সংক্রান্ত একটি মামলা নিম্ন আদালতে উঠেছিল। সেখানেও ট্রাম্পের এই ট্যারিফকে বেআইনি বলা হয়েছিল। কিন্তু এসবে কর্ণপাত করতে রাজি নন একগুঁয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বিদেশী পন্যের উপর শুল্ক সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্টের দারস্থ হতে পারেন ট্রাম্প।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে তিয়ানজিনে কি সত্যিই গড়ে উঠবে ‘রাশিয়া-ভারত-চিন ত্রিশক্তি জোট’? বহুমেরু বিশ্বের পথে এগোবে কি আন্তর্জাতিক রাজনীতি? আমেরিকার শুল্কনীতি কতটা কার্যকর প্রমাণিত হবে, আর কতটা নিজেদের নাগরিকদের অস্বস্তিতে ফেলবে? বিশ্বজুড়ে যখন বাণিজ্য যুদ্ধের আগুন জ্বলছে, তখনই রাষ্ট্রনেতাদের এই কৌশলগত চালচলন ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক ভারসাম্য কোন পথে নিয়ে যাবে, তা-ই এখন প্রশ্ন।
