অর্ণব দত্ত
রামায়ণের লঙ্কাকাণ্ডই ঘটত না, যদি না রাবণ সীতাকে অপহরণ করত। আর মহাভারতে দ্রৌপদীকে নিয়ে কৌরবরা টানাটানি না করলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধই হত না। এদেশের রামায়ণ, মহাভারত দুটি মহাকাব্য। প্রাচীনকালের পরে মধ্যযুগ পেরিয়ে বর্তমান দুনিয়ায় বিজ্ঞান প্রভূত উন্নতিলাভ করেছে। একইসঙ্গে অপবিজ্ঞানেরও রমরমা। সমাজে অনেকে ভালো, আবার অনেকে চোর-ডাকাত, ধর্ষক কিংবা হরেক কিসিমের অপরাধের সঙ্গে যুক্ত।
ভারতে দেবীর সংখ্যা অগুন্তি। মেয়েদের ভারতীয় সংস্কৃতিতে শক্তি হিসেবে আরাধনা করা হয়। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ককে জন্মজন্মান্তরের সম্পর্ক হিসেবে ধারণার জন্ম সেই প্রাচীনকালে। দাম্পত্য সম্পর্কের বিচারে স্বামীর অর্ধাঙ্গিনী স্ত্রী। ভগবান শিবের অন্যতম আরেকটি রূপ অর্ধনারীশ্বরের। আধুনিক বিজ্ঞান নারী এবং পুরুষ উভয়ের দ্বৈতসত্তা আছে, একথা ঘোষণা করেছে। এর অর্থ নারীর হৃদয়ে পুরুষ সত্তা, অন্যদিকে পুরুষের হৃদয়ে নারী সত্তা ভারতীয় ঐতিহ্যসম্মত। তবে নানা মুনির নানা মত সর্বকালীন। যেমন, মনুবাদী সংস্কৃতিতে নারী নরকস্য দ্বার।
ভারতে আট থেকে আশি তথা নাবালিকা থেকে প্রাপ্তবয়স্কা, এমনকি বৃদ্ধারাও অনেকক্ষেত্রে ধর্ষিত, নানান যৌন হেনস্থার শিকার। সত্য যুগ বলে নাকি একটি যুগ ছিল, ভারতীয়দের একাংশ তা বিশ্বাস করেন। বর্তমানে নাকি ঘোর কলিযুগ চলছে। ঘোর কলিতে ঘটবে ঘোরতর যাবতীয় অনাচার।
সম্প্রতি লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধি অভিযোগ করেছেন, “গোটা দেশে নারী তাঁর হৃদয়ে, মনে কী কল্পনা করবেন, তাতে শিকল পরানোর প্রয়াস চলছে। ভারতের পবিত্র মাটিতে এখন পিতৃতন্ত্রের দাপট চরমে। মেয়েদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পর্যবসিত করার যে চেষ্টা চলছে, এর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রাম চলবে।”
প্রেমপীরিতি বিশেষ করে পরকীয়া প্রেম সাধনের অঙ্গ ছিল অবিভক্ত ভারতের সন্ত সমাজেও। ২০১৮ সালে সুপ্রিম কোর্ট নারী এবং পুরুষের মধ্যে পরকীয়া প্রেম আইনত বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এদিকে ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর পেশ করা খতিয়ান অনুসারে, ভালোবাসা শুধুমাত্র যৌনতার কারবার হয়ে ওঠায়, তা রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটাচ্ছে। এনসিআরবি রিপোর্ট অনুসারে, ভালোবাসা নিয়ে গোলমালের জেরে কখনও বিবাহিত নারীও প্রেমিকের হাত মিলিয়ে স্বামীকে নৃশংসভাবে হত্যা করছে। তবে পুরুষ তার চেয়ে অনেক দূর বেশি এগিয়ে যৌনতার কারবার চালাতে নারীকে খুন করছে।
ভালোবাসা, যৌনতা সবই সামাজিক বিষয়। যদি এক্ষেত্রে প্রেমপিরীতির কথা ধরা যায়, তাহলে ভালোবাসার নামে যৌনতার কারবারে যে হারে খুনোখুনি চলছে করোনা পরিস্থিতির পর থেকে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতার সমতুল। বর্বরতার নিরিখে শিবঠাকুরের আপন দেশে যৌনতা শেষমেশ মহা গন্ডগোলের বিযয় হয়ে বিকৃত। করোনার পর থেকে এর জেরে খূনোখুনি এদেশে চলা সব ধরনের অপরাধের তালিকায় তৃতীয় স্থানাধিকারী।
ভারতীয় মহাকাশ বিজ্ঞানীরা একদিকে আকাশের ওপারে কী আছে, সেই চর্চায় সফল। এতে মহিলা বৈজ্ঞানিকদের বিশেষ অবদান রয়েছে পুরুষ বৈজ্ঞানিকদের পাশাপাশি। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে পরবর্তীকালে সুলতান কিংবা মুঘল আমলেও ভারতীয় নারী বীরের মর্যাদা পেয়েছে। যেমন, মণিপুরের রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা, ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে ঝাঁসির রানি লক্ষ্মীবাঈ, পরে মাতঙ্গিনী হাজরা থেকে কিংবা নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির ঝাঁসি রেজিমেন্ট-সহ বহু বিদ্রোহিনী স্বাধীনতা সংগ্রামে জীবন দিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় সরকারি সূত্রের খবর, কোভিডের পর ভারতের মাটিতে নারীর প্রতি অপরাধ আগের তুলনায় ১২ শতাংশের চেয়ে খানিক বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্বিচারে চলছে নারী অপহরণ। এরপর যৌনক্ষুধা মেটাচ্ছে পুরুষ।
এবাদে নারীর প্রতি সাইবার ক্রাইমের হারও ৪২ শতাংশের চেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বহুক্ষেত্রে সন্দেহবশত নারীকে খুন করছে স্বামী কিংবা তথাকথিত স্বামীর পরিবারের সদস্যরা। এক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা শহরের ভিতর দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু এবং জয়পুর। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে ভারত সম্পর্কিত খবরাখবরে ভারতে নারীর প্রতি মধ্যযুগীয় বর্বরতার দৃষ্টান্ত ফলাও করে পরিবেশিত হচ্ছে। এর কারণ বহুক্ষেত্রে যে প্রেম করতে চায়, সেই পুরুষের সঙ্গে প্রেম করতে রাজি নয় নারী। অনেকক্ষেত্রে বিবাহিতারা প্রেম প্রস্তাব পাচ্ছেন এবং তা নাকচ করছেন। এর জেরে আক্রান্তও হচ্ছেন।
নারী পরকীয়া সম্পর্কের জেরে স্বামী খুন করছে না, এমনও নয়। শীর্ষ আদালত স্বীকৃতি দিয়েছে, স্বামী পছন্দ না হলে একজন বিবাহিত নারী আরেকজন পুরুষের সঙ্গে পরকীয়া সম্পর্ক স্বাধীনভাবে চালিয়ে যেতে পারেন। এক্ষেত্রে স্বামী কিংবা তার পরিবারের সদস্যরা বাধা দিলে, কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট ২০১৮ সালে। কেউ কেউ মনের প্রেম বা প্লেটোনিক প্রেমে আস্থাশীল। বিজ্ঞানসম্মত ব্যাপার হল., প্রেম এবং যৌনতা একের অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। এর অর্থ নারী-পুরুষের অন্তরঙ্গ সম্পর্কে মনের পাশাপাশি শারীরিক সম্পর্ক যুক্তিসঙ্গত।
ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৮৫ নম্বর ধারা অনুসারে, বিয়ের পরও স্বামী হিসেবে নিজেকে দাবি করে যদি কোনও বিবাহিত মহিলাকে স্বামী কিংবা তার পরিবারের সদস্যরা কোনও ধরনের শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতন করেন পরকীয়ার দায়ে, পুলিশে অভিযোগ দায়ের হলে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হবে। তিন বছরের কারাবাসের পাশাপাশি আর্থিক জরিমানা দিতে হবে।
রামায়ণ, মহাভারতের আমলে যেমন শ্রীরামচন্দ্র সীতা অপহরণকারী রাবণকে উচিত শিক্ষা দিয়েছেন রামভক্ত হনুমান সোনার লঙ্কা ছারখার করায়। অন্যদিকে, শ্রীকৃষ্ণের উপদেশে ভ্রাতৃহত্যায় একেবারে নারাজ অর্জুন অন্য বীরদের পাশাপাশি শেষপর্যন্ত উচিত শিক্ষা দিয়েছেন দ্রৌপদীর অবমাননাকারী কৌরবপক্ষকে। আশার কথা হল, স্বাধীনতার ৮০ বছর পেরিয়ে নারীর সব ধরনের অধিকার আইন স্বীকৃত।