নিজস্ব প্রতিনিধি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা : কাকদ্বীপ এলাকায় কালনাগিনী নদীর ভয়াবহ দূষণ ঘিরে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া এই নদীতে প্রতিনিয়ত নোংরা আবর্জনা ও নিকাশি জল ফেলায় নদীর জল ক্রমশ কালচে রং ধারণ করছে। দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে গোটা এলাকা। পরিবেশবিদদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কাকদ্বীপ শহরের উপর দিয়ে প্রবাহিত কালনাগিনী নদী বর্তমানে কার্যত নর্দমায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় দু’ মাস ধরে নদীর জলের রং কুচকুচে কালো হয়ে রয়েছে। শুধু তাই নয়, তীব্র দুর্গন্ধে নদীর ধার দিয়ে চলাচল করাও দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। গরমের মধ্যে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
এলাকাবাসীর দাবি, নদীর পাশেই রয়েছে একাধিক শৌচাগার ও নিকাশি নালা। সেই নোংরা জল সরাসরি নদীতে গিয়ে মিশছে। এর পাশাপাশি প্রতিদিন কাকদ্বীপ বাজার সংলগ্ন এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ আবর্জনা নদীতে ফেলা হচ্ছে। বাজারের পচা শাকসবজি, মাছ ও মাংসের উচ্ছিষ্ট, প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য নদীতে ফেলার ফলে দূষণের মাত্রা দিন দিন বাড়ছে।
পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ হয়ে ওঠে ভাটার সময়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, ভাটার সময় নদীতে জল কমে গেলে পচা আবর্জনা উপরে উঠে আসে। তখন দুর্গন্ধ এতটাই তীব্র হয় যে আশপাশের বাড়িঘরে থাকা মুশকিল হয়ে পড়ে। জোয়ারের সময় কিছুটা জল বাড়ায় দুর্গন্ধ সামান্য কম অনুভূত হলেও দূষণ যে কমছে না, তা স্পষ্ট।
পরিবেশকর্মীদের মতে, এই নদীর জলে শুধু বাজারের আবর্জনাই ফেলা হচ্ছে না, মাংসের দোকান থেকে প্রতিদিন মুরগি ও খাসির নাড়িভুঁড়ি, রক্ত এবং অন্যান্য বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। এর ফলে জলে পচন ধরে মারাত্মক দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং নদীর স্বাভাবিক জলজ প্রাণীর অস্তিত্বও বিপন্ন হয়ে পড়ছে। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের সদস্য সৌমকান্তী জানা বলেন, “নদীর এই দূষণ শুধু পরিবেশের ক্ষতি করছে না, মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। এই জল আশপাশের কৃষিজমিতে পৌঁছালে ফসলেও তার প্রভাব পড়তে পারে। অবিলম্বে ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।”
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের একাংশও সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন। কাকদ্বীপ বাজারের ব্যবসায়ী সন্তোষ পাল বলেন, “বাজারের অনেক দোকান থেকে আবর্জনা ঠিকমতো ফেলার ব্যবস্থা নেই। ফলে অনেকেই নদীতেই ফেলে দিচ্ছে। এতে আমাদেরই অসুবিধা হচ্ছে। দুর্গন্ধে ক্রেতারাও বিরক্ত।” এ বিষয়ে পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে মনোজ কুমার মাইতি জানান, সমস্যার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। তিনি বলেন, “নদীতে যাতে আর আবর্জনা না ফেলা হয়, তার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাজার ও আশপাশের এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হবে এবং নিকাশি ব্যবস্থার উন্নতির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।”
তবে বাস্তবে এখনও পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও কড়াকড়ি পদক্ষেপ চোখে পড়েনি বলেই অভিযোগ স্থানীয়দের। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই দূষণের ফলে নদী ও নদীঘেঁষা এলাকার পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন। কালনাগিনী নদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ জলাধার এভাবে দূষিত হয়ে পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদরাও। তাঁদের মতে, নদী পরিষ্কার ও দূষণ বন্ধে অবিলম্বে সচেতনতা অভিযান, নিয়মিত সাফাই ও কড়া প্রশাসনিক নজরদারি প্রয়োজন। না হলে অচিরেই এই নদী কার্যত মৃত নদীতে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
