প্রফ. ডাক্তার প্রণব কুমার ভট্টাচার্য, এমডি (প্যাথলজি), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
চিকিৎসা বিজ্ঞান ও শারীরবৃত্তের (Physiology or Medicine) ক্ষেত্রে বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মান নোবেল পুরস্কারের জন্য ২০২৫ সালের বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এ বছর এই সম্মান যৌথভাবে পেয়েছেন তিন গবেষক: আমেরিকার মেরী ই. ব্রুঙ্কাও (Mary E. Brunkow), ফ্রেড র্যামসডেল (Fred Ramsdell) এবং জাপানের শিমোন সাকাগুচি (Shimon Sakaguchi)। মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম কীভাবে নিজেদের কোষ ও অঙ্গকে আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকে, সেই ‘পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স’ (Peripheral Immune Tolerance) সংক্রান্ত মৌলিক আবিষ্কারের জন্য তাঁদের এই পুরস্কারে সম্মানিত করা হলো। সুইডেন এর কারোলিনিস্কা ইনস্টিটিউট-এর ৫০ জনের নোবেল এসেম্বলি প্রতি বছর কে বা কারা চিকিৎসা বিজ্ঞান ও ফিজিওলজিতে নোবেল পুরস্কার পাবেন সেটা নিশ্চিত করেন । সর্বাধিক তিন জনকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। এই পুরস্কার ঘোষণার অনেক আগেই আমি নোবেল প্রাইজ অর্গানাইজেশন-এর ফেসবুকে ও বিভিন্ন সোশ্যাল নেটওয়ার্কস-এ বলেছিলাম, “অটোইমিউন সিস্টেম”-কে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হতে পারে। যদিও এক্ষেত্রে আমার দেওয়া সম্ভাব্য নোবেল বিজয়ীদের নামগুলো মেলেনি।
ইমিউন সিস্টেমের ‘নিরাপত্তা রক্ষী’
মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একটি অত্যন্ত জটিল ব্যবস্থা। এর প্রধান কাজ হল ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার মতো বহিরাগত ক্ষতিকারক জীবাণুকে বা এন্টিজেনকে চিহ্নিত করে ধ্বংস করা। কিন্তু কখনও কখনও এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভুল করে নিজের শরীরের কোষকেই শত্রু মনে করে আক্রমণ করে বসে, যা অটোইমিউন রোগ (Autoimmune Diseases) নামে পরিচিত। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (Rheumatoid Arthritis), মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস (Multiple Sclerosis) বা প্রথম ধরনের ডায়াবেটিসের (Type 1 Diabetes) মতো মারাত্মক রোগগুলি এই কারণেই দেখা দেয়। নোবেল কমিটি এই তিন বিজ্ঞানীকে ইমিউন সিস্টেমের এই আত্মঘাতী আক্রমণ প্রতিহতকারী কোষ, অর্থাৎ ‘রেগুলেটরি টি কোষ’ (Regulatory T Cells বা Tregs)-এর উপর তাঁদের যুগান্তকারী গবেষণার জন্য স্বীকৃতি দিয়েছে।
আবিষ্কারের মূল ভিত্তি
শিমোন সাকাগুচির সূত্রপাত (১৯৯৫): প্রথাগত ধারণা ছিল যে, ইমিউন সিস্টেমের ভুল আক্রমণ রোধ করার কাজটি মূলত থাইমাস গ্রন্থিতেই সম্পন্ন হয়। কিন্তু জাপানি বিজ্ঞানী শিমোন সাকাগুচি এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে প্রথম প্রমাণ করেন যে, ইমিউন সিস্টেমে একটি বিশেষ ধরনের টি-২৫ কোষ রয়েছে যা শরীরের বিভিন্ন অংশে ঘুরে বেড়ায় এবং আক্রমণাত্মক ইমিউন কোষগুলির কার্যকলাপে লাগাম টানে। তিনি এদের নাম দেন ‘রেগুলেটরি টি কোষ বা ট্রেগসেল’। আমাদের শরীরে অন্য টি কোষ গুলো টি সিডি৪ +কোষ ( সিডি হেলপার, সিডি ইন ডিইসের) টি ৮ +কোষ ( টি সাইটো টক্সিক কিলার, নাল, টিএইচ ১,২,১৭ ও ২৫) এই টি কোষগুলো বিভক্ত হয় থাইমাস গ্ল্যান্ডে গিয়ে টি কোষ রিসেপ্টর-এর মলিকিউলার গঠন তৈরী করতে যে মলিকিউলগুলো কোষগুলোর গায়ে লাগে।
Foxp3 জিনের সন্ধান (২০০১) : সাকাগুচির এই আবিষ্কারের পথ ধরে এরপর গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আনেন আমেরিকান বিজ্ঞানী মেরী ব্রুঙ্কাও এবং ফ্রেড র্যামসডেল। তাঁরা গবেষণায় দেখেন, যে সমস্ত ইঁদুরের মারাত্মক অটোইমিউন রোগ হয়, তাদের Foxp3 নামক একটি জিনে ত্রুটি বা মিউটেশন রয়েছে। তাঁরাই প্রথম দেখান যে, এই Foxp3 জিনটি রেগুলেটরি টি কোষের (ট্রেগ কোষ) উৎপাদন ও কাজের জন্য অপরিহার্য। এই জিনটি মানুষের ক্ষেত্রে আইপেক্স সিনড্রোমের (IPEX syndrome) মতো গুরুতর অটোইমিউন রোগের কারণ বলেও তাঁরা শনাক্ত করেন।
যোগসূত্র স্থাপন : পরবর্তীকালে সাকাগুচি প্রমাণ করেন যে, এই Foxp3 জিনটিই হল তাঁর আবিষ্কৃত রেগুলেটরি টি কোষগুলির প্রধান নিয়ন্ত্রক বা ‘মাস্টার রেগুলেটর’। এই যোগসূত্র স্থাপনের ফলেই পুরো রহস্যের সমাধান হয়— Foxp3 জিনের নির্দেশেই এই ট্রেগ রক্ষী কোষগুলি তৈরি হয়, যারা নিশ্চিত করে যে ইমিউন সিস্টেম যেন নিজেদের অঙ্গের ক্ষতি না করে।

চিকিৎসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন
স্টকহোমের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের নোবেল অ্যাসেম্বলি জানিয়েছে, এই আবিষ্কারগুলি চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ওলে ক্যাম্পের কথায়, “তাঁদের এই মৌলিক আবিষ্কারের ফলে আমরা বুঝতে পারি কেন সকলের অটোইমিউন রোগ হয় না। এটি ইমিউনোলজির একটি নতুন ক্ষেত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছে।”
এই গবেষণার প্রত্যক্ষ ফলস্বরূপ এখন :
- অটোইমিউন রোগের নিরাময় : রেগুলেটরি টি কোষগুলিকে ব্যবহার করে বা সেগুলির কার্যকারিতা বাড়িয়ে মারাত্মক অটোইমিউন রোগগুলিকে সম্পূর্ণ নিরাময় করার নতুন চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবন সম্ভব হবে।
- ক্যান্সার ও ইমিউনোথেরাপি : ক্যান্সারের চিকিৎসায় বর্তমানে ইমিউনোথেরাপি অত্যন্ত কার্যকর। এই কোষগুলির উপর গবেষণা করে ক্যান্সার চিকিৎসায় আরও উন্নত কৌশল তৈরি করা যাবে ভবিষ্যতে।
- অঙ্গ প্রতিস্থাপন: অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর গ্রহীতার শরীর যাতে দাতা অঙ্গটিকে প্রত্যাখ্যান না করে, সেই জটিলতা কমানোর ক্ষেত্রেও এই জ্ঞান বিশেষভাবে সহায়ক হবে।
বর্তমানে এই আবিষ্কারের উপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া বেশ কিছু চিকিৎসা পদ্ধতি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের স্তরে রয়েছে। বলা যায়, এই তিন বিজ্ঞানীর নিরলস গবেষণা বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত মানুষের জীবনে আশা এবং স্বস্তি এনে দেওয়ার এক বৈপ্লবিক সম্ভাবনা তৈরি করলো।
