ওঙ্কার ডেস্ক: ২০২৫ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন হাঙ্গেরির লেখক লাস্লো ক্রাসনাহর্কাই। তবে এই ঘোষণার আগে পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সাহিত্য মহলে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন ভারতের বিশিষ্ট সাহিত্যিক অমিতাভ ঘোষ। বুকমেকার ও সাহিত্য সমালোচকদের মতে, এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের অন্যতম সম্ভাব্য প্রার্থী ছিলেন তিনি। নাম ঘোষণা হওয়ার আগ পর্যন্ত ঘোষের পক্ষে জোরালো জল্পনা চলছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত পুরস্কার তাঁর হাতে না এলেও, অমিতাভ ঘোষের সাহিত্যকীর্তি আলোচনায় উঠে এসেছে বিশ্বজুড়ে।
অমিতাভ ঘোষের জন্ম ১৯৫৬ সালের ১১ জুলাই কলকাতায়। শৈশবে বাবার কূটনৈতিক পেশার কারণে তাঁকে বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। ভারতের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও ইরানেও কেটেছে তাঁর শৈশব। ডুন স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করে তিনি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসে স্নাতক ও সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সামাজিক নৃতত্ত্বে ডক্টরেট লাভ করেন। পেশাগত জীবনের শুরুতে সাংবাদিকতা করলেও, ধীরে ধীরে লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন এবং পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক সাহিত্যমঞ্চে নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেন।
১৯৮৬ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস ‘দ্য সার্কল অব রিজন’-এর মাধ্যমে অমিতাভ ঘোষের সাহিত্যজীবনের সূচনা হয়। সেই থেকেই তাঁর লেখার বিশেষ বৈশিষ্ট্য, জটিল ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে মানবিক সম্পর্কের মেলবন্ধন। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত ‘দ্য শ্যাডো লাইনস’ উপন্যাসটি তাঁকে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দেয়। দেশভাগ, সীমান্ত, স্মৃতি ও পরিচয়ের সংকট এই বিষয়গুলির সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ তাঁকে পাঠকমহলে বিশেষভাবে জনপ্রিয় করে তোলে। তাঁর অন্যান্য বিখ্যাত রচনার মধ্যে রয়েছে ‘দ্য গ্লাস প্যালেস’, ‘দ্য হাংরি টাইড’, ‘সি অব পপিজ’, ‘রিভার অব স্মোক’ ও ‘ফ্লাড অব ফায়ার’। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ নিয়ে লেখা ‘দ্য গ্রেট ডিরেঞ্জমেন্ট’, ‘দ্য নাটমেগস কার্স’ এবং সাম্প্রতিক গ্রন্থ ‘স্মোক অ্যান্ড অ্যাশেস’-এ তিনি তুলে ধরেছেন মানবসভ্যতার অস্তিত্ব সংকট ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দিকগুলি।
অমিতাভ ঘোষের লেখায় ইতিহাস, রাজনীতি ও পরিবেশগত প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত থাকে গভীর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। তাঁর রচনাশৈলী বিশ্লেষণধর্মী হলেও ভাষা কাব্যিক ও প্রতীকবহ। সাহিত্য সমালোচকদের মতে, তাঁর কাজ দক্ষিণ এশিয়ার উপনিবেশ-পরবর্তী অভিজ্ঞতার এক অনন্য ব্যাখ্যা।
লেখক হিসেবে তিনি যেমন আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন, তেমনি সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি পরিবেশবিষয়ক জনসচেতনতা নিয়েও কাজ করে চলেছেন। তাঁর অবদানকে স্বীকৃতি দিতে ভারত সরকার ২০০৭ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। ২০১৮ সালে তিনি জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পান। ইংরেজি ভাষায় লেখা সাহিত্যিক হিসেবে এই পুরস্কার প্রাপ্ত প্রথম ভারতীয় তিনি। এছাড়াও ইউরোপের নানা দেশে তাঁর রচনার অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে, এবং ২০২৪ সালে তাঁকে পরিবেশ-সচেতন সাহিত্য রচনার জন্য মর্যাদাপূর্ণ এরাসমাস পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়।
এ বছর নোবেলের সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় অমিতাভ ঘোষের নাম উঠে আসা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, ভারতীয় সাহিত্যজগতেরও এক গর্বের বিষয়। যদিও পুরস্কার শেষ পর্যন্ত তাঁর হাতে আসেনি, তবুও বিশ্বসাহিত্যের আলোচনায় ভারতের অবস্থানকে দৃঢ় করেছে তাঁর সাহিত্যকীর্তি। নোবেল না পেলেও, অমিতাভ ঘোষের নাম ও সাহিত্য মানবতার প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতার প্রতীক হয়ে থাকবে।
