কুশল চক্রবর্তী
অবশেষে আইনে রূপান্তরিত হল “প্রমশান এন্ড রেগুলেশান অফ অনলাইন গেমিং বিল, ২০২৫”। সংসদের দুই কক্ষেই সব পক্ষই এই বিলের স্বপক্ষে রায় দিল। অবশ্যই বিলের চিন্তাধারা প্রশংসনীয়। দেরীতে হলেও সরকার বাহাদুর বুঝতে পেরেছেন যে এই অনলাইন গেম আমাদের সমাজের কি পরিমান ক্ষতি করছে। সরকারের এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। আর কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়েই তাদের আর্থিক ক্ষতির কথা মেনে নিয়েও যে এই বিলের স্বপক্ষে মত দিয়েছে তাকেও বাহবা জানাতে হয়।
কিন্তু এই সত্যতা বুঝতে সরকারের এত দিন লাগল কেন ? ২০০৮ সালে তো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ড্রিম১১ এর মত কোম্পানি। ২০১৩ সালে তৈরি হয়েছিল পোকারবাজি কোম্পানির মত আরও সব কোম্পানি। (এই কোম্পানিগুলোর ঝুঁকিপূর্ণ আর্থিক লেনদেনের খেলাগুলো নিয়েই কিন্তু কথা হচ্ছে।) আসুন দেখা যাক এই কোম্পানিগুলোর বাড়বাড়ন্তের সঙ্গে অন্য কি “খেলা”আছে। এই অনলাইন কোম্পানিগুলো যাদের মধ্যে ড্রিম১১, পোকারবাজি, মাইরামিসার্কেল এরা তো টিভি আর অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সমাজে অতি পরিচিত নাম। এরা এই বিলের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে দারুণ এক সত্য বলে দিয়েছে। তারা বলেছে এবং এই বিষয়ে কয়েক জন বিশেষজ্ঞও বলেছেন যে, প্রতিবছর ভারত সরকার খুব কম হলেও ১৫০০০ থেকে ২০০০০ কোটি টাকার রাজস্ব কম পাবে এই গেমিং সংস্থাগুলোর খেলা বন্ধ হলে। এমনকি হয়ত ২ লক্ষ এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লোক তাদের রুজি রোজগার নিয়ে মুশকিলে পড়বে। যে বিদেশী কোম্পানিগুলো এই সব জায়গায় লগ্নি করত তা তারা আর করবে না। এমনকি ভারতে তাদের অন্য বিষয়েও লগ্নি কমে যাবে।
কিন্তু প্রশ্ন তো অন্য জায়গায়। দেখুন হিসাব বলছে, সাধারণ অবস্থায় এই কোম্পানিগুলোর ডিজিটাল আদান প্রদান হয় প্রতি মাসে ২০০০০ থেকে ৩০০০০ কোটি টাকার মতো। আর আই পি এল বা আই সি সি বিশ্বকাপের মত প্রতিযোগিতা এলে এই ডিজিটাল লেনদেনের পরিমান অনেক গুন বেড়ে যেত। তবেই দেখুন এতদিন যারা দাবি করছিল ভারতীয় অর্থনীতিতে নগদ লেনদেনের পরিমান কমে যাচ্ছে আর ডিজিটাল লেনদেন বেড়ে যাচ্ছে , তারা কিসের উপর ভিত্তি করে বলত তা বোঝা যাচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩ সালে ভারতে ডিজিটাল লেনদেনের সংখ্যা ছিল মাত্র ২২২ কোটি আর ২০২৪ সালে তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০৭৮৭ কোটি। এই লেনদেনের মাধ্যমে টাকার পরিমান দাঁড়িয়েছে ২৭৮৫ লক্ষ কোটি টাকা। এইবার বোঝা যাচ্ছে যে পরিমান ডিজিটাল লেনদেন বেড়েছিল তার অনেকটা অংশই ছিল এই ধরনের অনৈতিক ও মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ গেমিং বা খেলার মাধ্যমে। তাকে কি কখনই ভারতীয় অর্থনীতির উন্নয়নের সুচক বলে ধরা যায় বা প্রকৃত ডিজিটাল লেনদেনের উন্নতির সুচক হিসাবে গণ্য করা যায় ? একটা পরিসংখ্যান বলছে যে প্রতি বছর এই গেমিং কোম্পানির নানা খেলার প্রভাবে ৪৫ কোটি লোক ২০০০০ কোটি টাকা হারায়। শুধু তাই নয় এই খেলার ফলে অনেক লোক ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ে, শিকার হয় নানা মানসিক ব্যাধির। এমনকি কিছু মানুষ মানসিক অবসাদে আত্মহননের পথও নিয়েছে। তবুও একটা জনগনের দ্বারা নির্বাচিত সরকারের ১০ বছরের বেশী লাগল এটা বুঝতে !
এরপর দেখুন এই খেলায় নেশাগ্রস্থ লোকেদের যদি সামাজিক স্থরে কিছু না করা হয় তবে তারা বিদেশের গেমিং কোম্পানির খেলাগুলোতে আকৃষ্ট হবে। তাতে কিন্তু ভারতের ৮ লক্ষ কোটি টাকার মত লোকসান হবে। এর পরে তো আছে এই আইন প্রনয়নের ব্যাপারে সঠিক উদ্যোগ নেবার প্রচেষ্টা। আইন করেই যদি এমন সব সামাজিক আর অর্থনৈতিক অন্যায় বন্ধ করা যেত, তবে হয়ত এত বিতর্কের পর বহু লোকের কান্নার সঙ্গে জড়িত থাকা এক “পঞ্জি” স্কিমের কোম্পানির লোকেরা এ ভাবে বেকসুর খালাস পেত না।
