নিজস্ব প্রতিনিধি, দক্ষিণ ২৪ পরগণা: ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বাংলা তথা দেশের মেয়েদের শিক্ষার জগতে আলো জ্বালানোর ক্ষেত্রে যার নাম জড়িয়ে রয়েছে অনেকাংশে। তাঁর শিক্ষাদর্শকে সামনে রেখে কুলতলীর দেউলবাড়ী গ্রামে শুরু হয়েছে এক অভিনব উদ্যোগ। গ্রামের রাস্তায় থাকা প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি ইলেকট্রিক পোস্টে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ‘বর্ণপরিচয়’-এর অক্ষর। ইংরেজি সংখ্যা এবং প্রাথমিক গণিতের যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ। ফলে স্কুলে যাওয়ার পথই এখন হয়ে উঠেছে খোলা আকাশের নিচে এক চলমান পাঠশালা।
দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার ধারে থাকা ইলেকট্রিক পোস্টগুলি জঙ্গল ও আগাছায় ঢেকে ছিল। কোথাও ছেঁড়া পোস্টার, কোথাও ময়লা আবর্জনা— দেখতে ছিল অনাকর্ষণীয়। স্থানীয়দের সহযোগিতায় পোস্টগুলি পরিষ্কার করে সেখানে রঙিন অক্ষরে লেখা হয় অ-আ-ক-খ থেকে শুরু করে ১, ২, ৩—ইংরেজি ও বাংলা সংখ্যা, সঙ্গে সহজ অঙ্কের চিহ্ন।
এই উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন এলাকার বাসিন্দা পুলক মন্ডল। অনাকর্ষণীয় দৃশ্য বদলাতেই তিনি হাতে তুলি তুলে নেন। তিনি বলেন, সুন্দরবনের প্রান্তিক এলাকায় শিক্ষার আলো আরও ছড়িয়ে দিতে ‘এক টাকার পাঠশালা’ চালু করা হয়েছে। বিদ্যাসাগর নাকি মাইলস্টোন দেখে ইংরেজি সংখ্যা শিখেছিলেন— সেই ইতিহাস থেকেই এই অনুপ্রেরণা। তাই গ্রামের অবহেলিত ইলেকট্রিক পোস্টগুলিকেই শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার ভাবনা আসে তাঁর।
অন্যদিকে গ্রামের বাসিন্দারা জানান, আগে সন্তানদের নিয়ে পাঠশালায় যাওয়ার পথে এই পোস্টগুলোর দিকে কেউ তাকাত না। এখন বাচ্চারা হাঁটতে হাঁটতেই অক্ষর পড়ে, সংখ্যা গোনে। অভিভাবকরাও সুযোগ পাচ্ছেন সন্তানদের পড়াতে। এতে শিশুদের মধ্যে পড়াশোনার আগ্রহ যেমন বাড়ছে, তেমনি গ্রামজুড়ে তৈরি হয়েছে এক ইতিবাচক শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ।
বর্তমানে এলাকার খুদে পড়ুয়ারা এই উদ্যোগে ভীষণ খুশি। শুধু পড়ুয়ারা নয়, গ্রামবাসীরাও এই অভিনব প্রয়াসকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। অনেকেই মনে করছেন, এভাবে গ্রামের প্রতিটি কোণ যদি শিক্ষার বার্তা বহন করে, তবে আগামী প্রজন্ম আরও সচেতন ও শিক্ষিত হয়ে উঠবে।
কুলতলীর দেউলবাড়ীর এই উদ্যোগ আবারও প্রমাণ করে, ইচ্ছাশক্তি থাকলে সীমিত সম্পদ নিয়েও বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। বিদ্যাসাগরের আদর্শকে ধারণ করে এক টুকরো গ্রাম আজ শিক্ষার রঙে রাঙিয়ে তুলেছে নিজের পথঘাট।
