তাপস মহাপাত্র
ফের সিংহাসনে সম্রাট। হুংকার দিলেন- “Make America Great Again”। নড়চড়ে উঠল বিশ্ব। কিন্তু কোথায় যেন অপেক্ষা করছিল মেঘের ভ্রূকূটি। MAGA-র বিরুদ্ধে জেগে উঠল “Make Aqua Tofana Great Again” বা MATGA। ‘MATGA আন্দোলন’ নামে পরিচিত। সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে তখন যেন নেটযুদ্ধ। কিন্তু কি এই Aqua Tofana ? ‘MATGA আন্দোলন’-এর অঙ্গ হিসেবে একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়। যেখানে দেখা যায় মার্কিন মহিলারা পুরুষদের পানীয়তে বিষ মেশাচ্ছেন। কিন্তু কেন ? কেন মার্কিন মহিলাদের ট্রাম্পের প্রতি এই বিদ্বেষ ? তা জানতে হলে পিছিয়ে যেতে হয় ৮০০ বছর। সেটা ১৭ শতকের কথা। প্রাচীন খুনি গিউলিয়া টোফানার কাহিনি উঠে আসে, যা ছিল অত্যাচারী পুরুষদের থেকে মহিলাদের পরিত্রাণের একমাত্র পথ। সে সময় স্বামীর অত্যাচার থেকে বাঁচতে মহিলারা Aqua Tofana বিষ প্রয়োগ করতেন।
MATGA আন্দোলনের পিছনে ওই গিউলিয়া তোফানার অবদান রয়েছে। যিনি আবিষ্কার করেছিলেন ইতিহাস তোলপাড় করা বিখ্যাত অ্যাকোয়া তোফানা বিষ। যা ১৭ শতকে ইতালি জুড়ে ব্যবহৃত হত। বিষটি সাধারণত প্রতিদিনের প্রসাধনী পাত্রে লুকিয়ে রাখা হত। স্বাদ, গন্ধহীন ওই বিষের সম্পর্কে অজ্ঞ থাকতেন স্বামীরা।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে ট্রাম্পের ফের জয়লাভের “তোমার শরীর, আমার পছন্দ”-এর মতো নারী-বিদ্বেষী বাক্যাংশ নেটদুনিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পর শুরু হয়েছিল MATGA আন্দোলন। পুরুষরা অনলাইনে হামেশাই নারীদের হুমকি দিত যে তাদের শরীর আর তাদের নয়। সুতরাং, MATGA আন্দোলনটি ক্রমেই নারী-বিদ্বেষের শ্লোগান হয়ে ওঠে। কথা হল, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘Make America Great Again’ (MAGA) স্লোগানের বিরুদ্ধে কী ভাবে তীব্র প্রতিবাদ হিসেবে উঠে এল ১৭ শতকের Aqua Tofana। যা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছিল ‘Make Aqua Tofana Great Again’ বা ‘MATGA’ আন্দোলন। তাহলে পিছিয়ে যেতে হয় সালে। সে সময় অ্যাকোয়া টোফানা ছিল আর্সেনিক, সিসা এবং বেলেডোনার মিশ্রণে তৈরি একটি শক্তিশালী বিষ। যার উৎপত্তি ভূমধ্যসাগরের দ্বীপ সিসিলিতে। এর আবিষ্কারক সিসিলির রাজধানী পালেরমোর বাসিন্দা টিয়োফোনিয়া ডি আডামো। তাঁর নামানুসারেই এর নামকরণ বলে মনে করা হয়। সেই সময় এই বিষ তৈরি করে বিক্রি করা শুরু করেন টিয়োফোনিয়া। এই বিষের পাচার ও সঙ্গীকে হত্যার দায়ে ১৬৩৩ সালের ১২ জুলাই তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এর বছরখানেক আগে বিষ বিক্রির অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড হয় টিয়োফোনিয়ার সহযোগী ফ্রান্সেসকা লা সারদারের।
টিয়োফোনিয়ার মৃত্যুদণ্ডের পর রোমে পালিয়ে যান তাঁর কন্যা জুলিয়া টোফানা। অ্যাকোয়া টোফানার প্রসঙ্গে বার বার উঠে এসেছে এই জুলিয়ার নাম। রোমে গিয়ে গা ঢাকা দিলেও বিষ বিক্রির কাজ ছাড়েননি জুলিয়া। শোনা যায়, ফাদার জিরোলামো অফ সাঁ অ্যাগনেস ইন আগোনে ছিলেন এই বিষের মূল উপাদান আর্সেনিকের জোগানদার। সম্ভবত তিনি তা জোগাড় করতেন তাঁর ওষুধবিক্রেতা ভাইয়ের থেকে। তবে জুলিয়া একা নন, তাঁর সঙ্গে রোমে চলে আসেন আরও বেশ কয়েক জন মহিলা। এঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জিরোলামা। তাঁকে জুলিয়ার কন্যা বলেই মনে করা হয়। এ ছাড়াও এই চক্রে জিরোনিমা স্পানা, জিওভান্নো ডে গ্রান্ডিস, মারিয়া স্পিনোলা, গ্রাজ়িওসা ফারিনা নামে আরও কয়েক জনের খোঁজ পাওয়া যায়। এঁদের মধ্যে কেউ ছিলেন ধাত্রী, কেউ গর্ভপাতে সাহায্য করতেন, কারও বা পেশা ছিল জাদুবিদ্যা, আবার কেউ কেউ বেশ্যাবৃত্তি করতেন। তবে এঁরা সকলেই নিযুক্ত ছিলেন বিষ তৈরি এবং পাচারের কাজে।
এই বিষ বিশেষ এক কারণে ব্যবহার করা হত। শুধুমাত্র রোম নয়, রেনেসাঁর সময়কালে পালেরমো, নেপলস, পেরুজিয়া জুড়ে ব্যবহার ছিল এই তীব্র বিষের। তখন সময়টা এমন ছিল যে সমাজে মেয়েরা তাঁদের বাবা, ভাই কিংবা স্বামীর ‘সম্পত্তি’ হিসেবে বেঁচে থাকতেন। তাঁদের কোনো স্বাধীনতা ছিল না। বিবাহবিচ্ছেদে কেবলমাত্র ধনী পুরুষদেরই এক্তিয়ারে ছিল। কোনও যন্ত্রণাদায়ক সম্পর্ক থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় ছিল না মহিলাদের। স্বামীর নির্যাতন থেকে রেহাই পাওয়া কার্যত অসম্ভব ছিল। এই রকম পরিস্থিতিতেই নির্যাতিত মহিলাদের পরিত্রাতা হয়ে ওঠেন জুলিয়া। শোনা যায়, নির্দিষ্ট মাত্রায় চার বার খাওয়াতে পারলেই নিশ্চিত মৃত্যু। এই বিষের কোনো চিহ্ন মিলতো না শরীরে। তাই, স্বামীর নির্যাতন থেকে নিষ্কৃতি পেতে জুলিয়ার উপরে ভরসা করতে শুরু করেন অত্যাচারিত নারীরা। বিশেষ এই তরল নির্যাতিতাদের হাতে তুলে দিতেন জুলিয়া। সেই সময় ৬০০ জনেরও বেশি পুরুষের প্রাণ নেয় এই বিষ। এঁদের বেশির ভাগই বিবাহিত ছিলেন। সাধারণ ঘরের মহিলারা যেমন এই বিষ কিনতেন, তেমনই এলিট পরিবারের মহিলারাও একে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে বেছে নিতেন। কেরির ডাচেস আনা মারিয়াও নাকি আলডোব্রানডিনি নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি পেতে এই দলের সাহায্য নিয়েছিলেন।
মনে করা হয়, জুলিয়াই বিশ্বের প্রথম মহিলা সিরিয়াল কিলার। ১৬৫৯ সালে অ্যাকোয়া টোফানা তৈরি এবং সরবরাহের সঙ্গে জড়িত পাঁচ জন মহিলাকে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের থেকে যাঁরা বিষ কিনতেন এমন চল্লিশ জন নারীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছিল। অ্যাকোয়া টোফানা নিয়ে এমন যার কালা ইতিহাস, তাকে কেনইবা জড়ানো হল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। তবে কি এর মধ্য দিয়ে ‘MATGA’ আন্দোলনকারীরা ট্রাম্পের নারী অসম্মাননার কথাই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন ? আমেরিকার নানান ক্ষেত্রে ট্রাম্প এখন চর্চিত এবং নিন্দিতও। এর মধ্যে কি ফের মাথা চাড়া দিচ্ছে ‘MATGA’ ?
