ওঙ্কার ডেস্ক: বাংলা তথা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জগতে নেমে এসেছে গভীর শোক। প্রয়াত হলেন বিষ্ণুপুর ঘরানার অন্যতম প্রবীণ ও বিশিষ্ট শিল্পী, সঙ্গীতাচার্য পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ১০০ বছর। দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। তাঁর প্রয়াণে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক গৌরবময় অধ্যায়ের অবসান ঘটল বলে মনে করছেন শিল্পী ও সংস্কৃতিমহলের বিশিষ্টজনেরা।
১৯২৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কলকাতার এক সঙ্গীতপ্রেমী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বাবা সঙ্গীতাচার্য সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেই সঙ্গীতের হাতেখড়ি। ছোটবেলা থেকেই ধ্রুপদী সঙ্গীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। কঠোর সাধনা, নিষ্ঠা এবং দীর্ঘ অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি বিষ্ণুপুর ঘরানার অন্যতম প্রধান ধারক ও বাহক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ধ্রুপদ, খেয়াল, ঠুমরি এবং রাগসঙ্গীত পরিবেশনায় তাঁর নিজস্ব শৈলী ও গভীর ব্যাখ্যা তাঁকে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়। শিল্পীজীবনের পাশাপাশি শিক্ষকরূপেও তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। দীর্ঘদিন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গীত বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন তিনি। পরে বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বও সামলান। অবসরের পরও তিনি সঙ্গীতচর্চা ও শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশ্বভারতীতেও অতিথি অধ্যাপক হিসেবে তিনি কাজ করেছেন। শুধু শিল্পী বা শিক্ষক নন, সঙ্গীত গবেষক হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল সমান উজ্জ্বল। বিষ্ণুপুর ঘরানার ইতিহাস, রাগসঙ্গীতের বিবর্তন এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নানা দিক নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন। তাঁর লেখা ও গবেষণাকর্ম সঙ্গীতচর্চার ক্ষেত্রে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।
দীর্ঘ সঙ্গীতজীবনে তিনি অসংখ্য সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হন। রাজ্য ও জাতীয় স্তরে একাধিক সম্মাননার পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডি.লিট উপাধিতে সম্মানিত করে। শতবর্ষ অতিক্রম করেও তিনি সঙ্গীতচর্চা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। চলতি বছর শততম জন্মবর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গীত পরিবেশন বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। তাঁর প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে সঙ্গীত ও সংস্কৃতির অঙ্গনে। বিশিষ্ট শিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ, ছাত্রছাত্রী এবং অনুরাগীরা তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, পণ্ডিত অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু শুধু একজন কিংবদন্তি শিল্পীর প্রয়াণ নয়, বরং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক জীবন্ত ঐতিহ্যের অবসান।