নিজস্ব প্রতিনিধি, বিষ্ণুপুর: রাজা নেই, নেই রাজত্বও। তবু নিয়ম মেনে কৃষ্ণা নবমীতে দেবী এলেন সমারোহে। স্থানীয় গোপাল সায়েরে মহাস্নান পর্বের পর বড় ঠাকুরানী প্রবেশ করলেন সুপ্রাচীন মন্দিরে। রীতি মেনে পার্শ্ববর্তী গোপাল সায়েরের পাড় থেকে মুহুর্মুহু গর্জে উঠলো কামান। ঢোল, কাঁসর, সানাইয়ের শব্দে সূচীত হল দেবীর আগমন। গত ১০২৯ বছরের রীতি মেনে আজ এভাবেই বড় ঠাকুরানীর মন্দিরের সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন মল্ল গড় বিষ্ণুপুরে শুরু হয়ে গেল রাজ কূলদেবী মৃন্ময়ীর পুজো।
হাজার বছরের প্রাচীন রীতি অনুযায়ী সারা রাজ্যে পুজো শুরু হওয়ার সপ্তাহ দুই আগেই কৃষ্ণা নবমী তিথিতে মৃন্ময়ীর পুজো শুরু হয়ে যায় বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজ বাড়িতে। সোমবার সাত সকালে বিষ্ণুপুরের ফৌজদার পরিবারের হাতে আঁকা বড় ঠাকুরানীর পট নিয়ে রাজ পুরোহিতরা হাজির হন রাজ দরবার লাগোয়া মাধব সায়ের নামের একটি পুকুরে। হাজির হন রাজ পরিবারের সদস্যরাও। সেখানে একপ্রস্থ পুজো পাঠের মধ্য দিয়ে দেবীকে মহাস্নান করানো হয়।
এরপর সেই পট বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সহযোগে শোভাযাত্রা করে রাজ পুরোহিতেরা নিয়ে আসেন মৃন্ময়ী মন্দির চত্বরে। মন্দির চত্বরে বড় ঠাকুরানীর প্রবেশের মূহুর্তে গোপাল সায়েরের পাড় থেকে পরপর তিনটি তোপধ্বনী করা হয়। এরপর বড় ঠাকুরানীর পট রাখা হয় মন্দির চত্বরের একটি বেদীতে। সেখানে আরেক প্রস্থ পুজো পাঠের পর রাজ পরিবারের সদস্যারা দেবীকে বরণ করেন। এরপর পান পাতায় পা রেখে দেবী প্রবেশ করেন মৃন্ময়ীর মূল মন্দিরে। মূল মন্দিরের প্রবেশের মূহুর্তে আরো তিনটি তোপধ্বনী করা হয় গোপাল সায়েরের পাড় থেকে।
সুপ্রাচীন রাজ পরিবারের পুজো। তাই মৃন্ময়ীর পুজো পদ্ধতিও সম্পূর্ণ আলাদা। মল্ল রাজ পরিবারের একেবারে স্বতন্ত্র বলীনারায়নী পুঁথি অনুসারে এই পুজো হয়। পুজোর সুপ্রাচীন নিয়ম অনুসারে কৃষ্ণা নবমীতে মন্দিরে আসেন বড় ঠাকুরানী অর্থাৎ মহাকালী। এরপর মান চতুর্থীর দিন একই ভাবে মন্দিরে আসবেন মেজ ঠাকুরানী অর্থাৎ মহা সরস্বতী ও ষষ্ঠীর দিন মন্দিরে আসবেন ছোট ঠাকুরানী অর্থাৎ মহালক্ষ্মী। অষ্টমী ও নবমীর মধ্যরাতে মন্দিরে পুজো হবে খচ্চরবাহিনী বা মহামারীর। মহামারী থেকে প্রজাদের বাঁচাতেই এই পুজোর প্রচলন বলে শোনা যায়। কথিত আছে অতীতে শাক্ত মতে এই পুজো হত। হত নরবলিও! কিন্তু শ্রীনিবাস আচার্যের সান্নিধ্যে এসে মল্ল রাজ পরিবার বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর থেকেই জীব বলিদান প্রথা বন্ধ হয়ে যায়। বদলে শব্দকে ব্রহ্ম জ্ঞান করে সময় নির্ঘন্ট অনুযায়ী তোপধ্বনী করা হয়।
জানা যায় আজ থেকে এক হাজার বছর আগে মল্লরাজাদের রাজধানী ছিল জয়পুরের প্রদ্যুম্নপুর গ্রামে। কথিত আছে মল্ল রাজ জগৎমল্ল শিকারে বেরিয়ে একবার পথ ভুলে চলে আসেন বন বিষ্ণুপুরে। ক্লান্ত শরীরে জঙ্গলের মধ্যে একটি বটগাছের তলায় তিনি ঘুমিয়ে পড়লে বিভিন্ন দৈব ঘটনা ঘটতে থাকে তাঁর সঙ্গে। পরে তিনি দৈব নির্দেশে ৯৯৭ খ্রীষ্টাব্দে ওই বটগাছের তলায় দেবী মৃন্ময়ী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে তিনি মল্ল রাজধানী প্রদ্যুম্নপুর থেকে সরিয়ে বিষ্ণুপুরে নিয়ে আসেন। তারপর থেকেই মহাধূমধামে শুরু হয় দেবীর পুজো।
রাজত্ব থেকে রাজপরিবারের বিপুল পরিমাণ আয় থাকায় অতীতে পুজোর প্রতিটি আচার অনুষ্ঠানে ছিল বিপুল জেল্লা ও আভিজাত্য। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে মল্লরা রাজত্ব হারালেও কূলদেবী মৃন্ময়ীর পুজোতে তার তেমন প্রভাব পড়তে দেননি মল্ল পরিবার। ভাটা পড়েনি মৃন্ময়ী পুজোকে ঘিরে রাজপরিবারের নিষ্ঠা, ভক্তি ও বিষ্ণুপুরের মানুষের আবেগে। বয়সের বিচারে বাংলার অন্যতম প্রাচীন পুজো হলেও এই পুজোর নিয়ম নীতি রয়েছে প্রথম দিন থেকে প্রায় একই রকম। একসময় মৃন্ময়ীর তোপধ্বনী শুনে গোটা মল্ল রাজত্ব এমনকি গোটা রাঢ় বঙ্গে পুজোর নির্ঘন্ট পরিমাপ করা হত। এখন বিভিন্ন কারনে সেই তোপের আকার ছোট করে দেওয়া হয়েছে। মৃন্ময়ী মল্ল রাজ কূলদেবী হলেও বিষ্ণুপুরের আপামর মানুষের কাছে মৃন্ময়ীর পুজো এক আলাদা আবেগের নাম ।