অর্ণব দত্ত
ভারতে প্রতি ঘণ্টায় একজন করে শিশু আত্মঘাতী হচ্ছে। সমীক্ষা অনুসারে, ২০২০ সালে করোনা পরিস্থিতির সময় থেকে উদ্বেগজনক হারে এদেশের নাগরিক শিশুদের আত্মহত্যার হার উত্তরোত্তর ক্রমবর্ধমান। ২০২৫ সালে পাওয়া সর্বশেষ তথ্যানুসারে, ইতিমধ্যে ১০ হাজারের বেশি সংখ্যক শিশু আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, যে সমস্ত কারণে শিশুরা আত্মঘাতী হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে পারিবারিক অশান্তি, প্রেমপ্রীতিজনিত জটিলতা, এছাড়া পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার কারণেও সামাজিক লজ্জায় সারা দেশে হু-হু করে বৃদ্ধি পেয়েছে শিশুদের আত্মহত্যার হার। আরও জানা গিয়েছে, নাবালকদের তুলনায় নাবালিকাদের আত্মহত্যার হার বেশি। ৫৫ শতাংশ নাবালিকা আত্মঘাতী হচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে এর কারণ পারিবারিক হিংসা। বহুক্ষেত্রে শিশুরা আত্মহত্যার রাস্তা বেছে নিচ্ছে বাবা-মায়ের অবহেলার শিকার হয়ে। নাবালিকাদের আত্মঘাতী হওয়ার আরেকটি কারণ যৌন হিংসার শিকার হওয়া।
গত ১০ বছরে ছাত্রছাত্রীদের আত্মহত্যার হার ৮০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসম্পর্কে সর্বশেষ যে পরিসংখ্যান মিলেছে সেই অনুসারে, ১ লক্ষ ২৩ হাজারের বেশি ছাত্রছাত্রী আত্মঘাতী। এমনকি দেশের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি, যেমন আইআইটি, আইআইএমেও লাগাতার আত্মঘাতী মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা। অনেকক্ষেত্রে এর কারণ জাতপাতের বৈষম্য। তদন্ত রিপোর্টগুলিতে এব্যাপারে সত্য উদ্ঘাটিত হচ্ছে। ভারতে প্রতি ঘণ্টায় একজন করে শিশু আত্মঘাতী হচ্ছে। সমীক্ষা অনুসারে, ২০২০ সালে করোনা পরিস্থিতির সময় থেকে উদ্বেগজনক হারে এদেশের নাগরিক শিশুদের আত্মহত্যার হার উত্তরোত্তর ক্রমবর্ধমান। ২০২৫ সালে পাওয়া সর্বশেষ তথ্যানুসারে, ইতিমধ্যে ১০ হাজারের বেশি সংখ্যক শিশু আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরায় প্রকাশিত রিপোর্ট অনুসারে, গত দুদশকে দেশের সেরা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলিতে ছাত্রছাত্রীদের আত্মহত্যার হার ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আইআইটিগুলিও। গত দু’দশকে ১৬০ জন ছাত্রছাত্রী আত্মঘাতী হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে। গত পাঁচ বছরে আত্মঘাতীর সংখ্যা এসে ঠেকেছে ৬০জনে। একইসঙ্গে আইআইএমগুলিতেও ছাত্রছাত্রীরা নিজের হাতে জীবন হননে্র পথ বেছে নিচ্ছেন।
ভারতীয় সংস্কৃতিতে, আত্মহত্যা মহাপাপ। এসত্ত্বেও নিজের জীবন নিকেশ করার পথ বেছে নিচ্ছেন এদেশের প্রান্তিক সম্প্রদায়ের যে মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওঁরা জাতপাতভিত্তিক হিংসার তথা বৈষম্যের শিকার। মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের আত্মহত্যা রুখতে্ চলতি বছরে সুপ্রিম কোর্ট অভিমত প্রকাশ করেছে। দেশের শীর্ষ আদালতের ছাত্রছাত্রীদের আত্মহত্যার প্রবণতাকে “মহামারি” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ, ছাত্রছাত্রীরা অনেকক্ষেত্রে আত্মঘাতী হচ্ছে ওঁদের স্কলারশিপের টাকা আটকে থাকায়। এজন্যে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে দেশের ৬০ হাজার ৩৮৩টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতেও সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিলেও এই সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করা যাচ্ছে না।
এদিকে, দেশের সংবিধানের ২১ নম্বর ধারা অনুসারে, মানসিক সুস্বাস্থ্য প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকারের অন্তর্গত। এবাদে কোনও নাগরিক মানসলিকভাবে অসুস্থ বোধ করলে তাঁর জন্যে মানসিক চিকিৎসা পরিষেবার বন্দোবস্ত করাও সাংবিধানিক অধিকারের অন্তর্গত।
সূত্র্রের খবর, ভারতে মহিলাদের আত্মহত্যার হার সারা পৃথিবীর নিরিখে ৩৭ শতাংশ। এখবরও জানা গিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম মারফত। এর অন্যতম একটি কারণ একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে পরিবারগুলি নিউক্লিয়ার ফ্যামিলেতে পর্যবসিত হওয়া।
ফলে আত্মহ্ত্যার সার্বিক প্রতিরোধের পথ সমাজ সংস্কার, একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে, এও জরুরি প্রশ্ন। চলতি বছরে গত সেপ্টেম্বর মাসের ৬ তারিখ থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত “জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ সপ্তাহ” পালিত হয়েছে। পরিস্থিতি এরপর পরিবর্তিত হবে কিনা তা সময়ের অপেক্ষা। একটিই কথা বলার যে, মানবজীবন অমূল্য। সেই জীবনকে খতম করে দিচ্ছেন কেন মেধাবী ছাত্রছাত্রী থেকে সাধারণ নাগরিকরা, তা নিয়ে এবার কেবল সরকারকে নয়, ভাবতে হবে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকদেরও। এজন্যে প্রয়োজন আলোচনার পরিসর, পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া। এই সত্য যত শীঘ্র বাস্তবায়িত হয়, সমাজের পক্ষে তা মঙ্গলদায়ক ততই।