
সুমন গঙ্গোপাধ্যায়
শেষ পর্যন্ত ডায়মন্ড হারবারে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করল বিজেপি। তাঁর নাম অভিজিৎ দাস ববি। এই আসন গোটা বাংলা তথা দেশের কাছে অন্যতম ‘ হেভিওয়েট ‘ আসন। কারণ এই কেন্দ্র থেকেই দু’ বারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজনীতির অঙ্গনে কান পাতলেই শোনা যায়, দলের সাধারণ সম্পাদক ছাড়াও এই মুহূর্তে রাজ্যের ‘সেকেন্ড- ইন কমান্ড ‘। কার্যত হাই ভোল্টেজ এই আসনে কারা কারা প্রার্থী হচ্ছেন এই নিয়ে গোটা রাজ্যবাসীর জল্পনা ছিল।
বিশেষ করে এই কেন্দ্র থেকেই নিজে প্রার্থী হবেন বলে সরাসরি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী। যদিও শেষ পর্যন্ত এই কেন্দ্র থেকে নিজে আর প্রার্থী হওয়ার ‘ সাহস ‘ দেখাননি তিনি। তবে ইতিমধ্যেই তৃণমূলের ‘ যুবরাজ ‘ কে জোড় লড়াই দিচ্ছে বাম- কংগ্রেস প্রার্থী প্রতিকুর রহমান। কিন্তু প্রশ্ন ছিল কে হবেন পদ্ম প্রার্থী! উঠে আসছিল একাধিক নাম, তা কখনো মহাগুরু মিঠুন চক্রবর্তী, বা রুদ্রনীল ঘোষ হোক
শঙ্কুদেব পাণ্ডা, প্রিয়াঙ্কা টিব্রেওয়াল ,পাপিয়া অধিকারীরদের নাম ও শোনা যাচ্ছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত প্রার্থী করা হলো অভিজিৎ দাস (ববি)কে। বঙ্গ রাজনীতিতে কার্যত অপরিচিত নাম, এমনকী রাজনৈতিক মহলের মতে রাজ্যের কতজন বিজেপি কর্মী তাঁর নাম শুনেছেন সেটাও বড় প্রশ্ন। এর আগে ২০১৪ সালে এই কেন্দ্র থেকেই বিজেপি র টিকিটে দাঁড়িয়ে ২ লক্ষ ৮৮৫ টি অর্থাৎ প্রায় ১৫.৯২ % ভোট পান। সেই নির্বাচনেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ৫ লক্ষ ৮ হাজার ৪৮১ ভোট পেয়ে জয়ী হন, শতাংশ নিরিখে ৪০. ৩১ শতাংশ, আর সিপিএম প্রার্থী আবুল হাসনত ৪ লক্ষ ৩৭ হাজার ১৮৭ ভোট ( ৩৪.৬৬ শতাংশ) পান। ২০১৯ এর নির্বাচনে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় পান ৭ লক্ষ ৯১ হাজার ১২৭ টি ভোট অর্থাৎ প্রায় ৫৬.১৫ শতাংশ। বিজেপি র নীলাঞ্জন রায় পান ৪ লক্ষ ৭০ হাজার ৫৩১টি ভোট, অর্থাৎ ৩৩.৩৯ %। অপরদিকে বাম প্রার্থী ফুয়াদ হালিম পেয়েছিলেন ৯৩,৯৪১ টি ( ৬.৬৭%) ভোট।
অর্থাৎ ১৪ সালে পর ১৯ সালে ভোট ও শতাংশ কেন্দ্রে দুটি বৃদ্ধি পাই বিজেপির আর এই ২৪ এর নির্বাচনে তাই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো হেভি ওয়েট প্রার্থীর বিরুদ্ধে রাজ্যের প্রধান বিরোধীদল পাল্টা কোন হেভি ওয়েট প্রার্থীকেই ময়দানে নামাবে বলে ধারণা ছিল রাজনৈতিক মহলের,কিন্তু সেখানে প্রার্থী করা হলো অভিজিৎ দাস (ববি) কে। এই লোকসভা কেন্দ্রের যুগ্ম পর্যবেক্ষক তথা রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র প্রীতম দত্তের বক্তব্য,” সম্পূর্ণ ভুল ব্যখ্যা হচ্ছে, এর আগে এই কেন্দ্রে নীলাঞ্জন দা দাঁড়িয়েছিলেন কিন্তু ভোটে হেরে যাওয়ার পর আর ডায়মন্ডহারবার মুখো হননি, তাই এই জেলার কার্যকর্তাদের দাবি ছিল স্থানীয়, যিনি ডায়মন্ডহারবার কেন্দ্রটিকে হাতের তালুর মতো চেনেন এমন কাউকে প্রার্থী করা হোক, অভিজিৎ রায় স্থানীয় প্রার্থী দক্ষ সংগঠক রীতিমতো মাটি কামড়ে লড়াই করার মানুষ তাই তার সংগঠক কে প্রধানমন্ত্রী এবং বিজেপির পার্লামেন্টারি কমিটি ডায়মন্ডহারবার প্রার্থী করায় আমরা সবাই খুশি
অপরদিকে এই কেন্দ্রের সদ্য নাম ঘোষনা হওয়া প্রার্থী অভিজিৎ দাস ববির বক্তব্য, ” অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় হেভিওয়েট এটা কোথা থেকে ধারনা হলো? আমি উনার বিরুদ্ধে ২০১৪ সালে প্রার্থী ছিলাম, আমাকেই একাধিকবার মাস্তান দিয়ে আক্রমণ করিয়াছেন, ভয় পেয়ে, আর এখন ডায়মন্ড হারবারের মানুষজন বলছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ডায়মন্ড হারবারের গণতন্ত্রের পক্ষে অভিশাপ। আর ওকে নম্বর ১ নম্বর বা ২ নম্বর আপনারা বানিয়েছেন, ওকে অযথা ভয় পাওয়া মুর্খামি।” এ তো গেল বিজেপির বক্তব্য কিন্তু বাস্তবটা কি সত্যি কি আই এস এফ এর মত বিজেপিও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়ার ব্যবস্থা করল? বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক দেবাশিস ঘোষ এর বক্তব্য, ” এটা তো খুব সহজ অঙ্ক, এর জন্যে এত এতো গবেষনা করার প্রয়োজন কি আছে? একদিকে, এতো দেরী করে প্রার্থী দেওয়া, এবং সেখানে প্রায় অপরিচিত একটা মুখকে প্রার্থী করা, এই দুটি উদাহরন প্রমাণ করছে, কেন্দ্রীয় বিজেপি ঠিক কী চাইছে ।” তাঁর আরও ব্যখ্যা, ” অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই মুহূর্তে রাজ্যের পাশাপাশি গোটা দেশেও আবশ্যই এখন হেভিওয়েট নেতা। সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লড়াই করার মতো যে মুখ দরকার ছিল, অভিজিৎ দাস ঠিক অতি পরিচিতি বা লাইটওয়েট প্রার্থীও নন। সেক্ষেত্রে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এর বিরুদ্ধে ইনাকে প্রার্থী করে আসলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আসলে ওয়াকওভার দিয়ে দেওয়া।” দেবাশিস ঘোষ এর আরও ব্যখ্যা, ” আমি অনেক দিন থেকেই বলে আসছি পশ্চিমবঙ্গকে মহারাষ্ট্র মডেল এ নিয়ে আসতে চাইছে বিজেপি। আর ২০২৬ এ সেখানে একনাথ শিন্দ এর ভূমিকা তে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখা যাবে না, এমন গ্যারান্টি কেউ কি নিচ্ছে? আর তাই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এর মতো ‘মেসি’র বিরুদ্ধে যদি পাড়ার মিন্টু বা সেন্টুকে ম্যাচ খেলতে নামানো হয় নামানো হয় তাহলে খুব স্পষ্ট হয়ে যায়, কার স্বার্থে কেন এই দুর্বল প্রতিপক্ষকে নামানো। তবে একটুখানি বলতে পারি ডায়মন্ডহারবারে লড়াইটা বিজেপি যে বাইনারিতে তৈরি করছিল তা উল্টে গিয়ে লড়াইটা বরং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম প্রতিকুর রহমানেরই হবে কারণ খুব স্পষ্ট এক নওশাদ সিদ্দিকী এবং দুই বিজেপি আদপে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কেই বাড়তি অক্সিজেন দিয়ে দিল।”