অর্ণব দত্ত
এটিএম কার্ড হারিয়ে ফেলেছেন এক ভদ্রলোক। অগত্যা ভরসা চেক বই। পরনের পোশাক-আশাক ময়লা, মুখচোখের ভাবে বিপন্নতা। এককথায় দরিদ্র কিংবা দারিদ্রসীমার তলায় থাকা একজন নাগরিক। ২৫০ টাকা তুলবেন। হয়তোবা ওষুধ কিনতে হবে। অথবা কোনও জরুরি প্রয়োজন মেটাবেন। সরকারি ব্যাঙ্কের ক্যাশ কাউন্টারে বসা যুবতী ক্লার্ক বয়স্ক সেই মানুষটিকে মুখঝামটা দিয়ে বললেন, এরপর থেকে এত কম টাকা তুলতে চেক বইয়ের পাতা নষ্ট করবেন না।
অধিকাংশ সরকারি ব্যাঙ্কের ক্যাশ কাউন্টারে ১০ টাকা, ২০ টাকা, ৫০ টাকা থাকে না। এমনিতেই দেশ জুড়ে ১০ টাকা, ২০ টাকা এবং ৫০ টাকার নোটের ভীষণ আকাল। এই পরিস্থিতিতে রিভার্জ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া স্থানীয় বাজার, রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকা কিংবা হাসপাতাল লাগোয়া জনাকীর্ণ এলাকাগুলিতে হাইব্রিড এটিএম মেশিন বসাতে চলেছে। তাতে মিলবে খুচরো পয়সাও।
ইতিমধ্যেই এই সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেছে আরবিআই। ভারতের শহরতলি ও গ্রামীণ এলাকায় এটিএম নিয়ে বিস্তর সমস্যা। প্রয়োজনের তুলনায় এটিএমের সংখ্যা কম। অনেকসময়ে আবার মেশিন আউট অব সার্ভিসে থাকছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অল ইন্ডিয়া রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশন এই সমস্যা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেওয়ার আর্জি জানিয়েছে। কাজ কবে মি়টবে বলা মুশকিল। কেননা কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রক অভিযোগ মানতে নারাজ। ফলে নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতির শিকার অসংখ্য গ্রাহক।
আরবিআই ১০, ২০ এবং ৫০ টাকা এবং খুচরো পয়সা তোলার জন্যে সারা দেশে মোট কটি হাইব্রিড এটিএম মেশিন বসাবে, এখনও ঘোষিত নয়। তবে আরবিআই সূত্রের খবর, ২০২৭ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে বিভিন্ন সরকারি ব্যাঙ্কের এটিএম পরিষেবা উন্নত করা হবে। মূলত প্রযুক্তিগত উন্নয়ন। বর্তমানে সারা দেশে যত সংখ্যক এটিএম আছে, এর ৩৪ শতাংশই বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলির মাধ্যমে পরিচালিত। ভারতের সবমিলিয়ে এটিএম মেশিন এবং ক্যাশ রিসাইক্লেলার মেশিনের সংখ্যা ২ লক্ষ ১০ হাজার থেকে ২ লক্ষ ৫১ হাজারের মতো। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া সূত্রেই এই হিসেব জানা গিয়েছে।
এটিএম মেশিন তৈরি করে বেসরকারি সংস্থাগুলি। সবমিলিয়ে মোট ১০টি সংস্থা মেশিনগুলি তৈরি করে। এটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বপ্নের প্রকল্প “মেক ইন ইন্ডিয়া”র অন্তর্গত। সূত্রের খবর, এই সংস্থাগুলির ভিতর রয়েছে এনসিআর কর্পোরেশন, সিএমএস ইনফো সিস্টেম, লিপি ডাটা সিস্টেম-সহ আরো সাতটি কম্পানি।
সূত্রের খবর, ২০২৭ সালের মার্চের ভিতর বিভিন্ন সরকারি ব্যাঙ্কের এটিএম মেশিনে প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণের কাজ সম্পন্ন হবে। এপর্যন্ত ৮,০০০ মেশিনের প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও বাকি এটিএমগুলির ক্ষেত্রে এধরনের কোনও উদ্যোগের কথা সরকার এখনও জানায়নি।
সূত্রের খবর, যে ব্যাঙ্কগুলির এটিএম এবং ক্যাশ রিসাক্লেলার মেশিনের প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ করা হবে, সেই তালিকায় রয়েছে ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া, ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্ক-সহ বেশ কিছু ব্যাঙ্ক। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার বক্তব্য, ডিজিটাল সিকিওরিটি, গ্রাহক সুরক্ষা এবং লেনদেনে স্বচ্ছতা আনতে এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবে। গ্রাহকদের অনেকেই হয়তো জানেন না এটিএম মেশিনের সম্প্রসারিত অর্থ। এটিএম মেশিন হল অটোমেটেড ট্রেলার মেশিন। সারা দেশে থুচরো টাকাপয়সার অভাব সামলাতে কত সংখ্যক হাইব্রি়ড মেশিন বসানো হবে, তা না জানা গেলেও আরবিআইয়ের দাবি, এতে সাধারণ যাত্রী, ছোট ব্যবসায়ীরা বিশেষভাবে উপকৃত হবেন।
কেন্দ্রীয় সরকারি সূত্রের খবর, ২০২৫ সাল থেকে ১০, ২০ এবং ৫০ টাকার নোটের আকাল দেখা দেওয়ার ফলে ভোগান্তি চরমে উঠেছে দিনমজুর, ছোট ব্যবসায়ী তথা দোকানি, হকারদেরও। চলতি বছরের শুরুতে কেবলমাত্র মুম্বইয়ের একটি ব্যাঙ্কে হাইব্রিড এটিএম পরিষেবা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করে দেখা হয়। কবে বাকি ক্ষেত্রে এধরনের পরিষেবা চালু হবে, আরবিআই পাইলট প্রকল্পের ফলাফল খতিয়ে দেখার পরে কেন্দ্র এসম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবে। তবে এখনও দিনক্ষণ ঘোষিত হয়নি। এদিকে অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, হাইব্রিড এটিএম চালু করেই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। পরিস্থিতি সামলাতে ১০, ২০ এবং ৫০ টাকার নোট ছেপে তা বাজারে আনলে স্থিতিশীল অবস্থা দেখা দেবে।