অমিত গোস্বামী
২৫ নভেম্বর, সন্ধ্যা সোয়া ৭টায়, ১৭ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র প্রচার করা হয় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের ফেসবুক পেজে। যাতে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন ও তার স্ত্রীর পাশাপাশি তাদের ছেলে বিগত দশ বছরের দুর্দশা ও নিদারুণ করুণ স্মৃতি তুলে ধরেন। এ তথ্যচিত্র তৈরি করা হয়েছে বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে, নাম দেওয়া হয়েছে ‘আয়নাঘর ফাইলস’। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ‘গুম’ হওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে এই এ তথ্যচিত্র নির্মাণ শুরু।
২০১৫ সালের ১০ মার্চ গুম হওয়ার ৬১ দিন পর একে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলং শহরে পাওয়া যায়। প্রায় দশ বছর সেখানে অবস্থান করেন। দেশে ফেরার পথ সুগম হয় ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর। ১১ আগস্ট তিনি দেশে ফেরেন। এটা মোটামুটি প্রচারিত তথ্য। বাংলাদেশের ঘটনা বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়। কিন্তু ভারতের গল্প তিনি যা যা বিবৃত করেছেন তা সত্যগোপন ও বিকৃত তথ্য যা ভুল মূল্যায়ন করছে ভারতের।
২০১৫ সালের ১০ মে তাঁকে পাওয়া গিয়েছিল শিলং গলফ লিংক রোডে। কিছু প্রাতঃভ্রমণকারী তাঁকে দেখে বাংলাদেশি অনুমানে পুলিশে খবর দেন। পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যায়। যে কোন কারণেই হোক তিনি নিজের পরিচয়দানের ক্ষেত্রে এতটাই অসংলগ্ন কথাবার্তা বলেন যে পুলিশ নিয়মানুযায়ী স্থানীয় হাসপাতালে তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষার পরে তাঁকে আটক রাখে এই জন্যে যে তাঁর পরিচয় তখনও শিলং পুলিশের কাছে অজানা। পুলিশ এবার তাঁকে স্থানীয় মানসিক হাসপাতালে পাঠায়। সম্ভবত মিনহানস নানদি হাসপাতালে। সেখানকার ডাক্তারের কাছে তিনি নিজের সত্য পরিচয় দেন এবং স্ত্রীর ফোন নম্বর দেন। ডাক্তারবাবু সত্যতা যাচাইয়ের জন্যে সেই নম্বরে ফোন করেন এবং পরিচয় নিশ্চিত করেন। এরপরে মানবিক কারণে তাঁকে স্ত্রী হাসিনা আহমদের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন চিকিৎসকের ফোনের মাধ্যমে।
এবারে পুলিশ বিষয়টি ভারতীয় স্বরাস্ট্র দপ্তরকে জানায় এবং সালাহউদ্দিন আহমদ বাংলাদেশে প্রাণসংশয়ের কারণে ফেরত যেতে রাজী নন বলে জানান। ফলে আইনমাফিক তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় অনুপ্রবেশের অভিযোগে। এটাই রুটিন পদ্ধতি। ভারতের সরকারি আধিকারিক তাঁর স্ত্রীকে নিয়মিত তাঁর সংবাদ দিতেন এবং বিরুদ্ধতা সত্ত্বেও তাঁর স্ত্রী’র ভিসা মঞ্জুর করে ঠিক দুই মাস পর শিলংয়ে আসার ব্যবস্থা করা হয়।
গ্রেপ্তারের পরদিন অর্থাৎ ১১ মে মিনহানস নানদি হাসপাতালে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরে ১২ মে তাকে চিকিৎসার জন্যে পাঠানো হয় শিলং সিভিল হাসপাতালে। সেখানে সরকারি খরচে তার চিকিৎসা হয় এবং ভিআইপি সুবিধায়। ৫ জুন, ২০১৫ তাকে শিলং এর জজ কোর্ট শর্ত সাপেক্ষে জামিন দেয় এই শর্তে যে সালাহউদ্দীন আহমেদ ইস্ট খাসি হিলস জেলায় আপাতত থাকবেন। তারিখ খেয়াল করে দেখুন, সালাহউদ্দিন আহমদের জেলবাস ৪৮ ঘন্টাও নয়। তাও নিজ পরিচয় গোপন করার কারণে। বাকি সময় হাসপাতালের ভিআইপি কেবিনে।
কিন্তু তিনি এবারে থাকবেন কোথায় ? সরকারি অনুরোধে তাঁর থাকার ব্যবস্থা হল শিলংয়ের সানরাইজ গেস্ট হাউজ-এ যে গেস্ট হাউজটি যথেষ্ঠ স্বাচ্ছন্দযুক্ত। তিনি গতকালের ভিডিওতে বলেছেন যে ‘‘২০১৮ সালের সম্ভবত ২৬ অক্টোবর মামলা থেকে খালাস পেলেও আমাকে আর বাংলাদেশে প্রেরণ করা হল না।“ আদালতের রায়ে শুধু খালাস নয়, আদালত তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন। এখানেই বিপদে পড়লেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
২০১৬ সালের ১১ জুলাই তাঁর পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়েছিল। ভারত সরকার তাঁকে ভ্রমণ অনুমোদন বা ট্রানজিট পারমিট দেয় যার জোরে তিনি ভারত ছেড়ে যে কোন রাস্ট্রে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু বাংলাদেশে তাঁর বিপুল সম্পত্তি আছে। ভারত সরকারের কাছে তিনি প্রাণ সংশয়ের সম্ভাবনা দেখিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করলেন। কিন্তু এক্ষেত্রে আদালতের অনুমতি প্রয়োজন কারণ আদালত তাঁকে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে।
ভারত সরকার তাঁর এ দেশে অবস্থান নিশ্চিত করার জন্যে নিম্ন আদালতের খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করল উচ্চতর আদালতে। সালাহউদ্দিন আহমদ শিলংয়ের সানরাইজ গেস্ট হাউজ-এ পুলিশি নিরাপত্তায় নিশ্চিন্তে থাকা শুরু করলেন। বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার অনেকবারই তাঁকে ফেরত চেয়েছিল ‘বন্দী প্রত্যর্পণ’ চুক্তি দেখিয়ে। ভারত প্রত্যাখ্যান করেছিল বিষয়টি সাব-জুডিস দেখিয়ে। ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি উচ্চতর আদালতে খালাস পান সালাহউদ্দিন। আবার আদালত তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এবারে বাংলাদেশ সরকার সক্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের তৎপর হয়ে ওঠে সালাহউদ্দিন আহমেদকে ফেরত পেতে। ভারত সরকার তাঁর সম্ভাব্য হয়রানি ও বিপদের সম্ভাবনা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমেদকে ফেরত দিতে অস্বীকার করে ও বিশেষ রেসিডেনশিয়াল পারমিটের ব্যবস্থা করে। তিনি বহাল তবিয়তে শিলংয়ের সানরাইজ গেস্ট হাউজ-এ পুলিশি নিরাপত্তায় বাস করেন এবং ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ এ শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পরে ১১ অগাস্ট তিনি ঢাকায় ফেরেন।
ভারতে সালাহউদ্দিন আহমেদ যে জামাই আদরে ছিলেন, এ’কথা তিনি দেশে ফেরার পরে বলেছিলেন। কিন্তু যে কথাগুলি বলেননি তা হলঃ
এক, শিলংয়ের সানরাইজ গেস্ট হাউজ-এর খরচ কে দিয়েছে ? তিনি নিজে দিলে কিভাবে দিয়েছেন ? নাকি তিনি ভারত সরকারের আতিথেয়তায় ছিলেন বলে যেটা শোনা যায় সেটা কি সত্যি ? তিনি দিয়ে থাকলে তার পেমেন্ট ডক্যুমেন্ট আছে নিশ্চয়ই, সেটা দেখান।
দুই, তিনি যে ভারতে সম্পূর্ণ পুলিশি নিরাপত্তায় সসম্মানে ছিলেন দীর্ঘ ১০ বছর, তার উল্লেখ কোথায় ?
তিন, ভারত সরকার তাঁর ভারতে অবস্থান নিশ্চিত করেছিল ও তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যর্পণের আবদার প্রত্যাখ্যান করেছিল, তার উল্লেখ কোথায় ?
চার, ২০১৬ সালের ১১ জুলাই তাঁর পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে ভারত যে তাঁকে ট্র্যাভেল ডক্যুমেন্ট ও পরে তাঁর অনুরোধে রেসিডেনশিয়াল পারমিট দিয়েছিল তার উল্লেখ কোথায় ?
পাঁচ, ভারত তাঁকে যে শারীরিক অবস্থায় পেয়েছিল সেই অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ সরকারি ব্যয়ে তাঁকে পুরোপুরি সুস্থ (অস্ত্রোপচার সহ) করে তুলেছিল তার উল্লেখ কোথায় ?
আজ সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের ফেসবুক পেজে বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নির্মিত ‘আয়নাঘর ফাইলস’-এ তাঁর বাংলাদেশে ‘গুম’ হওয়ার ৬১ দিনের স্মৃতি বিবৃত করেন তখন আমাদের সমব্যাথী হতেই হয়। কিন্তু তারপরের ১০ বছর ভারতে জামাই আদরে থাকার কথা নীরবতার মোড়কে ঢেকে অনুল্লেখিত রাখেন, তখন তাঁর ঈমান প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তাঁকে অকৃতজ্ঞ মনে হয়। ভারতের ‘অতিথি দেবো ভবঃ’ নীতি বাংলাদেশিদের প্রতি দেখানো যে সঠিক নয়, মনে হয়। রাজনীতির ক্রীড়নক হতে হলে বিবেক বিসর্জণ বোধ হয় বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের চরিত্র এবং তাদের রাজনীতির মূল মূলধন ভারতবিরোধিতা সে যে দলেরই হোন।
