মৌসুমী পাল
ভারতের প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ আবার এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘ অশান্তির পর অবশেষে ত্রেয়াদশতম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে পদ্মাপারে। ভোটের আগে রাজপথে উত্তেজনা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দলবদল, গুঞ্জন, ভীতি সবকিছু নিয়ে পড়শি দেশের রাজনৈতিক মহলে বর্তমান এক অনিশ্চয়তার গন্ধ। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে চলা অরাজকতা শেষ হতে পারে এই নির্বাচনের চুড়ান্ত ফলাফলের পর। তবে তা নিশ্চিতভাবে নির্ভর করছে দেশের অন্তরবর্তী সরকারের ভূমিকার উপর। এমনিতেই এই জাতীয় নির্বাচনকে সুষ্টভাবে সম্পন্ন করার দায়িত্ব তাঁর। এজন্যই অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল। তবে যে ভাবে ইউনুস সরকার পরিচালনা করে এসেছেন তা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে এই অশান্তি, অরাজকতার শেষ নেই বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
বাংলাদেশের এই নির্বাচন আগের যেকোনো নির্বাচনের থেকে আলাদা। কারণ এবার লড়াই কেবল রাজনৈতিক দলের মধ্যে নয়, লড়াই এক নতুন ধরনের নেতৃত্ব, অন্তর্বর্তী শাসনব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশের মধ্যে। এই প্রেক্ষাপটে এক প্রশ্ন বারবার উঠে আসছে, মুহাম্মদ ইউনুসের ভাগ্য কি বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ করবে ?
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ হিসেবে ইউনুসের আন্তর্জাতিক পরিচিতি দীর্ঘদিনের। ক্ষুদ্রঋণ আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি গ্রামীণ অর্থনীতির মুখ বদলে দিয়েছিলেন। যদিও তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। তবুও রাজনীতির ময়দান অর্থনীতির পরীক্ষাগার নয়। এখানে নীতি যতটা জরুরি, তার থেকেও বেশি জরুরি ক্ষমতার ভারসাম্য, গ্রহণযোগ্যতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা।
দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দেশের যুব সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল। দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, দমনপীড়ন এসবের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমেছিল অনেকদিন। সেই ক্ষোভের মুখে পড়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন বাংলাদেশের জনক মুজিব কন্যা হাসিনা। তারপরই উঠে আসে একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনের ধারণা, যার নেতৃত্বে আসেন ইউনুস। প্রথম দিকে এই পরিবর্তন অনেকের কাছেই আশার আলো হয়ে উঠেছিল। মনে হয়েছিল, দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকা একজন মানুষ হয়তো স্বচ্ছ প্রশাসনের পথ খুলে দেবেন।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের জন্মলগ্নে পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলিকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। হাসিনা শাসনকালে যে দলগুলিকে প্রান্তিক করে রাখা হয়েছিল, জেলে আটক করা হয়েছিল দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে যাতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করা যায়। কিন্তু হাসিনা দেশ ছেড়ে যাওয়ার পরই এবং ইউনুসের অন্তরবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে শপথ গ্রহণ করে, সর্বপ্রথম সেইসব দলকে প্রকাশ্যে আনতে তৎপর হয়ে ওঠে। এবং দেশের সর্ববৃহৎ দল আওয়ামী লিগকে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখা হয়। ইউনুসের এই পাকিস্তানপন্থী দলের প্রতি ঝোঁক নিয়ে অবশ্য কিছু রাজনৈতিক দল সরব হলেও আখেরে তেমন প্রভাব ফেলেনি ইউনূসের পদক্ষেপের পর।
সময় যত গড়িয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে রাজনীতিতে নিরপেক্ষতা ধরে রাখা সহজ নয়। বিশেষ করে যখন দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা হয় তখন গনতন্ত্রের উপর এক প্রশ্নচিহ্ন ওঠে। এই অবস্থার সুযোগ নিয়েই শক্তি বাড়াচ্ছে অন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলি। বিএনপি এবং ধর্মভিত্তিক দলগুলির উত্থান নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। একদিকে তারা নিজেদের বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে সমাজের মধ্যে বিভাজনও বাড়ছে। সংখ্যালঘু, নারী এবং প্রগতিশীল অংশের মধ্যে আশঙ্কা পরিবর্তনের নামে যদি আরও রক্ষণশীল শক্তি ক্ষমতায় আসে, তবে অর্জিত অধিকারগুলো কী টিকে থাকবে ?
অন্যদিকে পদ্মাপারের এই জাতীয় নির্বাচনে নারীদের অবস্থান এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত এক দশকে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বনির্ভরতার ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়েছে ঠিকই, কিন্তু রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তাদের নিরাপত্তাবোধে বড় ধাক্কা দিয়েছে। কার উপর ভরসা করবেন তা নিয়ে যথেষ্ট দ্বিধায় গ্রামাঞ্চলে বহু মহিলা ভোটার। উন্নয়ন নাকি নিরাপত্তা ? অর্থনৈতিক স্থিতি নাকি সামাজিক স্বাধীনতা ? এই দ্বন্দ্বই নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ইউনুস যদি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটেন, তবে সেই সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল করবে এবং দেশকে আরও গভীর সংকটে ঠেলে দিতে পারে।
অন্যদিকে, তরুণ প্রজন্মের মনোভাবও জটিল। তারা পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্লান্ত। জুলাই বিক্ষোভ তারই প্রমাণ। বাংলাদেশের যুব সমাজ দুর্নীতি ও ক্ষমতার রাজনীতির বাইরে একটি নতুন বাংলাদেশ চায়। হাসিনার পতনের পর ইউনুসের ব্যক্তিত্ব তাদের কাছে আকর্ষণীয় হলেও, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে যদি স্বচ্ছতা না থাকে বা গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত হয়, তবে সেই সমর্থন দ্রুত ক্ষয়ে যেতে পারে। তরুণদের প্রত্যাশা খুব স্পষ্ট স্বাধীনতা, কর্মসংস্থান এবং মর্যাদা। কেবল নৈতিক বক্তৃতা দিয়ে তাদের ধরে রাখা সম্ভব নয়। সেখানে এই দেড় বছরে ইউনুস কতটা যোগ্য নেতৃত্ব ছিল তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের এই যুব সমাজই।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে দ্রুত উত্থানশীল দেশ। তৈরি পোশাক শিল্প, প্রবাসী আয়, অবকাঠামো উন্নয়ন, এই সব দিকে বৈশ্বিক নজর এখন ঢাকার দিকে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বা অগণতান্ত্রিক ইমেজ বিদেশি বিনিয়োগে প্রভাব ফেলে। ইউনুসের আন্তর্জাতিক পরিচিতি এখানে সুবিধা দিলেও, দেশের ভেতরের অশান্তি সেই সুবিধাকে ম্লান করে দিতে পারে।
বাংলাদেশের মানুষ বহু সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র অর্জন করেছে। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন প্রতিটি অধ্যায়ে সাধারণ মানুষের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বড়। তাই কোনও এক ব্যক্তির হাতে দেশের ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণ নির্ভর করা উচিত নয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই মুহূর্তে ইউনুসের সিদ্ধান্তই পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল বা অস্থিতিশীল করতে পারে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা ব্যক্তিকে ঘিরে নয়, প্রক্রিয়াকে ঘিরে। নির্বাচন কতটা স্বচ্ছ, কতটা অংশগ্রহণমূলক এবং কতটা বিশ্বাসযোগ্য সেই উত্তরেই লুকিয়ে আছে দেশের ভবিষ্যৎ। তিনি যদি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেন, বাংলাদেশ এগোবে। আর যদি গণতন্ত্র দুর্বল হয়, তবে সেই অভিঘাত বহন করতে হবে গোটা দেশকেই।
