বিশ্বব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। যেখানে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশের নদীগুলোকে মারাত্মক দুষিত করেছে সে দেশের পোশাক শিল্প। অথচ বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ জোগান দেয় এই শিল্প।
বাংলাদেশে প্রকাশিত ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহত্তর ঢাকা এলাকার ৭ হাজারেরও বেশি কারখানা প্রতিদিন প্রায় ২৪০ কোটি (২.৪ বিলিয়ন) লিটার অপরিশোধিত বর্জ্য ও দূষিত পানি নিকটবর্তী জলাশয়গুলোতে ফেলে। দেশের অভ্যন্তরে আইন প্রয়োগের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশের কম খরচের সুবিধা ভোগ করছে, অথচ এর ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষতির বোঝা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বহন করতে হচ্ছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, “এর মাশুল যারা দিচ্ছেন তারা হলেন—কৃষক। তাঁরা আর নদীর জল দিয়ে সেচকাজ চালাতে পারছেন না। এদিকে, বছরের পর বছর ধরে টেক্সটাইল বা কাপড়ের ধুলিকণা জমা হয়েছে পোশাক শ্রমিকদের ফুসফুসে। এমন কি, নদীর তীরবর্তী বস্তির শিশুদের মধ্যে মারাত্মক ভাবে এর প্রভাব পড়েছে। যদিও দেশে ২৭৩টি ‘লিড’ সনদপ্রাপ্ত পরিবেশ বান্ধব বা ‘গ্রিন’ কারখানা রয়েছে, তবুও সামগ্রিক অগ্রগতি সীমিতই রয়ে গেছে। কারণ, এই সনদগুলো “স্বয়ংক্রিয়ভাবে এমন কোনো নিশ্চয়তা দেয় না যে পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ওয়েট প্রসেসিং, ডাইং, ওয়াশিং এবং বর্জ্য জল নিষ্কাশনের বিষয়টি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে।” ‘দ্য ল্যানসেট কমিশন’-এর বাংলাদেশ বিষয়ক এক প্রতিবেদনে প্রাক্কলন করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ২৬.৬ শতাংশের জন্যই দায়ী বায়ু, জল ও মাটি দূষণ।
বহুজাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো প্রকাশ্যে ‘কার্বন নিরপেক্ষতা’, ‘সার্কুলার ফ্যাশন’ বা ‘নেট-জিরো সাপ্লাই চেইন’-এর মতো চলনসই উন্নয়ন বা স্থায়িত্বের লক্ষ্যমাত্রার কথা ঘোষণা করলেও, তাদের উৎপাদন কেন্দ্রগুলো দূরবর্তী ও দরিদ্র দেশগুলোতে অবস্থিত হওয়ায় তারা করপোরেট সাসটেইনেবিলিটি বা স্থায়িত্ব বিষয়ক প্রতিবেদন থেকে পরিবেশগত ক্ষতির প্রকৃত হিসাব গোপন রাখতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তরে জনবল ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়; এছাড়া জরিমানার পরিমাণও প্রায়শই এত কম হয় যে তা অবৈধ কার্যক্রম রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, “যদি বর্জ্য শোধনের খরচ অবৈধভাবে বর্জ্য ফেলার জন্য সম্ভাব্য জরিমানার চেয়ে বেশি হয়, তবে দূষণ ঘটানোই অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বা যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হয়।”
প্রতিবেদনে সরকারকে দূষণকারীদের ওপর জরিমানার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করার পাশাপাশি নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের নাম প্রকাশ এবং তদারকি বা মনিটরিং সংক্রান্ত তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, “বিষয়টি ক্রমশ জরুরি হয়ে উঠছে কারণ পরিবেশগত বিধিবিধান মেনে চলার বিষয়টি এখন কেবল অভ্যন্তরীণ আইনি বাধ্যবাধকতার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার একটি শর্তে পরিণত হয়েছে।”