কুশল চক্রবর্তী
চেকের মাধ্যমে গ্রাহকের দুটি আলাদা আলাদা ব্যাঙ্কের লেনদেনের নাম ক্লিয়ারিং সিস্টেম। ব্যবসার প্রয়োজনে এই ব্যবস্থার পরিবর্তনের দরকার ছিল। ভারতের রিসার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া তা করলেন বটে, কিন্তু নিয়মের পরিবর্তন আনার পর থেকেই দেখা গেল চেক ক্লিয়ারিং প্রক্রিয়াটাই মুশকিলে পড়ে গেছে। আজকের এই ডিজিটাল দুনিয়ায় ব্যবসার প্রয়োজনে এক বাক্তির টাকা যত তাড়াতাড়ি অন্য বাক্তির কাছে পৌঁছানোটাই শ্রেয়। তার জন্য ভারতীয় রিসার্ভ ব্যাঙ্ক প্রত্যেক ব্যাঙ্কে এমন ভাবে চেক ক্লিয়ারিং করতে বলল যাতে কিনা একদিনের মধ্যেই এক বাক্তির টাকা আরেক বাক্তির অ্যাকাউন্ট এ পৌঁছে যায়। যেটা কিনা আগে অন্তত ৩৬ ঘণ্টা লাগত। ২০১৪ সালের পর থেকেই ভারতের মানুষ দেখেছেন, সরকার যে কোনও নতুন পরিকল্পনা নিয়ে আসে, তা নানা অসুবিধার সন্মুখীন হয়। যেমন ধরা যাক কৃষি বিল আনা হল। এতগুলো শ্রম দিবস, এত অর্থের অপচয়ের পর সরকার তা তুলে নিলেন। বিমুদ্রাকরণ করা হল। তাতে ৪০বারের বেশী নিয়ম পরিবর্তন করা হল। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ইলেক্ট্রোরাল বণ্ড তুলে নেবার আগে সরকারকে মামলার জন্য খরচ করতে হল অনেক আনেক টাকা।
এবার দেখা গেল অক্টোবর মাসের ৪ তারিখ থেকে আপামর ক্লিয়ারিং চেকের লেনদেনে গ্রাহকের চরম অসুবিধা। একদিনের মধ্যে গ্রাহক তো টাকা পাচ্ছেই না, বরঞ্চ তাকে আগের থেকেও বেশী অপেক্ষা করতে হচ্ছে অপর ব্যাঙ্ক থেকে টাকা আসতে। এর কারণ কি ? এখন কোনও ব্যাঙ্কে অন্য ব্যাঙ্কর চেক জমা দিলে তা একটা যন্ত্রের মাধ্যমে তার ছবি পৌঁছে যায় একটি ক্লিয়ারিং হাউসে। সেখান থেকে তা পৌঁছায় যে ব্যাঙ্কের চেক তাদের কাছে। তারা এবার সেই বাক্তির অ্যাকাউন্ট এ টাকা থাকলে, সেই চেক দিয়ে বাক্তির অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে তা পাঠিয়ে দেয় যে ব্যাঙ্কের থেকে ওই চেক এসেছিল তাদের অ্যাকাউন্ট এ জমা করার জন্য। আগে এই কাজগুলো হত দিনের শেষে একটি চেকের সরণি বা ব্যচের মাধ্যমে। এখন রিসার্ভ ব্যাঙ্ক বলল চেক ব্যাঙ্কে জমা পড়া মাত্র তা যন্ত্রের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিতে হবে ক্লিয়ারিং হাউসে। প্রথম অসুবিধা হল এই যে চেক যন্ত্রস্থ করার জন্য একটা লোক রাখতে হবে। সেই লোক চেকটি ব্যাঙ্কেকে জমা পড়া মাত্র যন্ত্রের মাধ্যমে ক্লিয়ারিং হাউসে পাঠিয়ে দেবে।
এত দিন ধরে কি হত, চেক জমা করে রাখা হত বিকেলের দিকে কোনও একজন ব্যাঙ্ক কর্মী অন্য সব কাজ করে, সব চেক ক্লিয়ারিং হাউসে ৫টার মধ্যে একটি ব্যাচ করে পাঠিয়ে দিত। এখন এটা করতে গেলে এক ঘণ্টা অন্তর অন্তর ব্যাচ করতে হবে। অন্য দিকে যে চেকগুলো নানা কারণে ফেরত হত তার পরিনতি কি হবে তাও পরিস্কার নয় শাখা লেভেলে। আগে কিন্তু ফেরত চেকের তালিকা পরিস্কার ভাবে চলে আসত শাখায়। আরবিআই বলছে, এই নতুন বাবস্থার জন্য প্রশিক্ষণের দরকার ছিল। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বেড়ালের গলায় ঘণ্টাটা বাঁধবে কে। ব্যাঙ্কের সব শখায় এখন লোক বাড়ন্ত। কে পাঠাবে কর্মী, ক্লিয়ারিং প্রশিক্ষণের জন্য। চেক ক্লিয়ারিং বাবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ আছে এনসিপিআইয়ের। তাদের কাজের অবস্থা কোনও ব্যাঙ্ক কি জানে ? এরপর তো আছে যান্ত্রিক গোলযোগের ব্যাপার। এক মুহূর্তের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে পুরো প্রক্রিয়ার কি হবে তাও এখনও জানা নেই। এই চেক ক্লিয়ারিং সম্বন্ধে গভীর জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল যে, এই প্রক্রিয়া শুরুর আগে যে ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ছিল তা একবারেই নেওয়া হয়নি।
অতএব এটা বোঝা গেল সরকার বা আরবিআইয়ের সদিচ্ছা থাকলেও পুরো বাপারের প্রতি কোনও সঠিক পরিকল্পনা ছিল না। আর এই যে এর পর আরবিআই বলছে ২ ঘণ্টা বা তিন ঘণ্টা অন্তর এক ব্যাংকের চেক দিয়ে অন্য ব্যাঙ্কের লোক টাকা পেয়ে যাবে, তবে আরটিজিএস (RTGS) বা এনইএফটি (NEFT) আর কে করবে। আর তা যদি লোক না করে, তবে এই পরিষেবার জন্য ব্যাঙ্ক যে কিছু হলেও টাকা অর্জন করত, তার কী হবে। বা এখন যে লোকটা ব্যাঙ্কে আরটিজিএস (RTGS) বা এনইএফটি (NEFT) করছে তাকে কি ক্লিয়ারিংয়ের কাজ করতে হবে ? চিন্তার কারণ আরও আছে আরবিআই বা বিভিন্ন মিডিয়ায় উঠে আসছে যে, আগামী ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে দু ঘণ্টার মধ্যে আপনার চেক ক্লিয়ারিং সিস্টেমের মাধ্যমে টাকার লেনদেন করবে। তা কিন্তু আরও চিন্তার কারণ হয়ে উঠবে। ১৯ অগাস্ট ২০২৪-এর সিধান্ত প্রয়োগ করতে যদি ২০২৫-এর ৪ অক্টোবর করা যায়, তবে ২০২৬ এর সিদ্ধান্ত কি পিছিয়ে দেওয়া যায় না ? মনে রাখতে হবে প্রতারকেরা কিন্তু এই তাড়াহুড়োর সুযোগ নিতে পারে। অতএব ক্লিয়ারিং সিস্টেম ত্রুটিমুক্ত হলে গ্রাহকের মঙ্গলই হবে বলে মনে হয়।
