• ভি অনন্ত নাগেশ্বরণ
ধারাবাহিক উন্নয়নের প্রাথমিক শর্ত আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ। সেজন্যই ২০২৩ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘের ধারাবাহিক উন্নয়নমূলক লক্ষ্যসমূহের ১৭টি ক্ষেত্রের মধ্যে ৭টিই হল আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ সংক্রান্ত। এক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ ব্যাঙ্কিং পরিষেবা বঞ্চিতদের কাছে এই পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া। কারণ, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকা সংগঠিত ব্যাঙ্কিং ক্ষেত্রে প্রবেশের প্রথম ধাপ।
ব্যাঙ্কিং পরিষেবা সকলের কাছে পৌঁছে দিয়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণের প্রাথমিক শর্ত নিশ্চিত করায় সুচিন্তিত এবং কাঠামোগত ও নীতিগত হস্তক্ষেপ জরুরি। বাস্তবে তার প্রয়োগের জন্য লালকেল্লা থেকে তাঁর প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেন, প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনার কথা। ২০১৪-র ২৮ অগাস্ট এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ সংক্রান্ত জাতীয় কর্মসূচির আওতায়। এই অভিযানের মূল কথা ধরা রয়েছে “আমার খাতা, ভাগ্যবিধাতা” শ্লোগানটির মধ্যে। লক্ষ্য, দরিদ্র ও ব্যাঙ্কিং পরিষেবার বাইরে থাকা প্রতিটি নাগরিককে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাপনার মধ্যে নিয়ে এসে ভারতের উন্নয়ন যাত্রার অংশীদার করা। জন ধন অ্যাকাউন্ট জিরো ব্যালেন্সে কোনও মাশুল ছাড়াই খোলা যায়। প্রক্রিয়া খুবই সরল এবং কেওয়াইসি বা ই-কেওয়াইসি সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতাও কম। রুপে ডেবিট কার্ড এবং ২ লক্ষ টাকার দুর্ঘটনা বীমার সুবিধাও পাওয়া যায়। ওভার ড্রাফট্ করা যায় ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
সূচনার পর থেকেই অভূতপূর্ব সাফল্যের সাক্ষী থাকে এই যোজনা। ২০২৪ সালে ইকনোমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি পত্রিকায় লেখা হয় “ভারতে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকা মানুষের সংখ্যা ২০১৪ থেকে ২০১৭-র মধ্যে ২৬ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। যাকে বলা যেতে পারে, বিশ্বের বৃহত্তম আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ উদ্যোগ। এই বৃদ্ধির হার সারা বিশ্বে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সংখ্যার বার্ষিক বৃদ্ধির হারের (৬.৫৭) দ্বিগুণ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বৃদ্ধির হারের (৭.২৭) তিনগুণ”। ২০২৫–এর ৮ অগাস্ট পর্যন্ত ৫৬ কোটিরও বেশি জন ধন অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। এর ৬৭ শতাংশ গ্রামীণ ও আধা-শহুরে এলাকায় থাকা ব্যাঙ্কের শাখায়। প্রকল্পটি লিঙ্গ অসাম্যও কমিয়েছে। জন ধন যোজনা অ্যাকাউন্টের ৫৫ শতাংশ – অর্থাৎ ৩১ কোটিরও বেশি মহিলাদের। জন ধন অ্যাকাউন্ট সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তিরও পথ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি সংসদীয় তথ্যে দেখা যাচ্ছে যে, প্রধানমন্ত্রী জীবন জ্যোতি বীমা যোজনা এবং প্রধানমন্ত্রী সুরক্ষা বীমা যোজনায় নথিভুক্তদের এক-তৃতীয়াংশ প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনার সঙ্গে যুক্ত।
প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনা ভারতের ডিজিটাল জনপরিকাঠামোর ভিত্তি হয়ে উঠেছে। লেনদেনের সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে গণতন্ত্রীকরণ এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে প্রবেশের সুযোগ বৃদ্ধি এক্ষেত্রে উল্লেখ্য। সরাসরি সুবিধা হস্তান্তর কর্মসূচির সাফল্যকে ভিত্তি হিসেবে রেখে প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনা পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, অপচয় হ্রাস ও সরকারের প্রতি আস্থা বৃদ্ধির কাজে সফল হয়েছে। জন ধন–আধার-মোবাইল ত্রয়ী ডিজিটাল লেনদেনের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। জন ধন অ্যাকাউন্ট এবং ইউনিফায়েড পেমেন্টস্ ইন্টারফেস–এর মিথষ্ক্রিয়া অসংগঠিত ক্ষেত্রের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক উদ্যোগপতিদের ব্যবসার কাজে সংগঠিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সুযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এনপিসিআই–এর সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, ইউপিআই–এর মাধ্যমে লেনদেনের বেশিরভাগটাই খাদ্য ও মুদিখানার জিনিস ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত। বলা বাহুল্য যে, এই ক্ষেত্রটিতে রয়েছেন প্রধাণত ক্ষুদ্র উদ্যোগপতিরাই। এর থেকে স্পষ্ট আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণের উদ্যোগ এবং ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা তৃণমূল স্তরে প্রতিদিনের ব্যবসা-বাণিজ্যে কতটা পরিবর্তন এনেছে।
জন ধন যোজনার প্রভাব শুধুমাত্র আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ‘অ্যাক্সেস টু ব্যাঙ্কিং, সেভিংস অ্যান্ড কনজাম্পসন স্মুদিং ইন রুরাল ইন্ডিয়া’ শীর্ষক ২০২২ সালের একটি প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে যে, ব্যাঙ্কিং পরিষেবা ভোগব্যয় সংক্রান্ত আদান-প্রদান অনেক সহজ করে। কারণ, এক্ষেত্রে সঞ্চয় সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা সাময়িকভাবে কিছুটা হলেও কমে যায়। এই বিষয়টি দরিদ্র মানুষের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রযোজ্য। একইভাবে, ২০২১ সালে এসবিআই -র একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনার সঙ্গে অপরাধের হারের ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক রয়েছে। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বেশি রয়েছে, এমন অবস্থায় মাদক গ্রহণের প্রবণতা কমে।
সকলের কাছে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা সুলভ করে তোলার লক্ষ্য এখন নাগালের মধ্যে। পরবর্তী লক্ষ্য হ’ল– আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণের ফলে পাওয়া পরিষেবার ব্যবহার বৃদ্ধি করা। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ফিনান্সিয়াল ইনক্লুশন ইনডেক্স অনুযায়ী পাওয়া তথ্য আশা-ব্যঞ্জক। এই সূচক তৈরি হয় আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণের তিনটি মাত্রাকে পরিমাপ করে– সুগম্যতা (৩৫%), ব্যবহার (৪৫%) এবং গুণমান (২০%)। সূচকাঙ্কটি ২০২১ সালের পর থেকেই ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে তা দাঁড়ায় ৬৭’তে। আমরা যদি শূন্যকে সকলের বঞ্চিত থাকার অবস্থা হিসেবে ধরি এবং ১০০’কে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণের সম্পৃক্তি বিন্দু হিসেবে দেখি, তা হলে বলতেই হয় যে, ভারতে এক্ষেত্রে প্রসার ও প্রয়োগ দুটি দিকেই অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে।
ব্যাঙ্কিং পরিষেবা বঞ্চিতদের অর্থনীতির মূল ধারায় নিয়ে আসার বিষয়টি একবারের একটি সাফল্য হিসেবে দেখা উচিৎ নয়। আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণের পথে একটি প্রাথমিক ধাপ হিসেবেই তার বিবেচনা হওয়া উচিৎ। অন্তর্ভুক্তিকরণের পর, পরবর্তী ধাপে প্রাপ্য যাবতীয় পরিষেবা সঠিকভাবে নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া গেলে প্রকৃত অর্থেই মানুষের জীবন জীবিকা ও সমৃদ্ধির পথ সুনিশ্চিত হবে।
