নিজস্ব সংবাদদাতা : রাজ্যে নির্বাচন-পরবর্তী হিংসা সংক্রান্ত একটি জনস্বার্থ মামলায় বৃহস্পতিবার আইনজীবীর পোশাকে কলকাতা হাইকোর্টে হাজিরা দেওয়ার পর, বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া (বিসিআই) পশ্চিমবঙ্গ বার কাউন্সিলের কাছে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এনরোলমেন্ট এবং পেশার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বার কাউন্সিলের সচিবকে লেখা এক চিঠিতে, আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক শীর্ষ সংবিধিবদ্ধ সংস্থাটি নির্দেশ দিয়েছে যে, মমতা ব্যানার্জীর তালিকাভুক্তি, রাজ্য আইনজীবী তালিকায় তাঁর নাম থাকা, মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর পেশা স্থগিত বা বন্ধ থাকা, এবং পরবর্তীকালে পুনরায় পেশা শুরু করার বিষয়ে নথি দুই দিনের মধ্যে জমা দিতে হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, “বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের মাধ্যমে বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার নজরে এসেছে যে, পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন কলকাতার মাননীয় হাইকোর্টে আইনজীবীর পোশাক পরে উপস্থিত হয়েছিলেন।”
আইনজীবীদের পেশাগত আচরণবিধি ও পোশাক-পরিচ্ছদ সংক্রান্ত বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার নিয়মাবলীর কথা উল্লেখ করে বিসিআই-এর প্রধান সচিব শ্রীরামন্তো সেন বলেন যে, ২০১১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাংবিধানিক পদে থাকার জন্য রাজ্য বার কাউন্সিলের রক্ষিত সরকারি নথি থেকে তাঁর “নথিভুক্তি, আইনচর্চা, কোনো স্থগিতাদেশ (যদি থাকে) এবং পুনরায় আইনচর্চা শুরু (যদি থাকে)-এর প্রকৃত অবস্থা” যাচাই করা প্রয়োজন।
বিসিআই তাঁর নথিভুক্তি নম্বর, নথিভুক্তির তারিখ, রাজ্যের আইনজীবী তালিকায় তাঁর নাম এখনও আছে কিনা এবং মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি আইনচর্চা স্থগিত বা বন্ধ করার কথা জানিয়েছিলেন কিনা, সেই সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে।
এতে আরও জানতে চাওয়া হয়েছে যে, পুনরায় আইনের পেশা শুরু করার জন্য কোনো আবেদন করা হয়েছিল কিনা এবং বর্তমানে তাঁর পক্ষে আইনচর্চার বৈধ সার্টিফিকেট আছে কিনা। এই বিজ্ঞপ্তিতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বার কাউন্সিলকে সমস্ত সহায়ক নথির এপিডেভিট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে স্টেট রোলের এন্ট্রি, তালিকাভুক্তি রেজিস্টার, স্থগিতাদেশ বা পুনরায় অনুশীলনের রেকর্ড, ইনওয়ার্ড রেজিস্টার, চিঠিপত্রের ফাইল এবং সংশ্লিষ্ট ফাইলের টীকা।
বিসিআই আরও নির্দেশ দিয়েছে যে, এই বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত মূল নথি “তাদের বর্তমান রূপে” সংরক্ষণ করতে হবে এবং জবাব দাখিল না হওয়া পর্যন্ত নথিপত্রের কোনো পরিবর্তন, পুনর্লিখন, সংযোজন বা পুনর্গঠন করা যাবে না। সম্প্রতি সমাপ্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর ব্যাপক ভোট-পরবর্তী হিংসার অভিযোগ এনে দায়ের করা একটি জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থ সারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চের সামনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাজিরা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেই এই ঘটনাটি ঘটে। নীল পাড়ের সাদা শাড়ির ওপর কালো উকিলের পোশাক পরে হাজির হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যুক্তি দেখান যে, ভোট পরবর্তী হিংসায় বিশেষ করে নারী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে, “এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে” পৌঁছেছে। তিনি কলকাতা হাইকোর্টের সামনে বলেন, “রাজ্যে নির্বাচন-পরবর্তী হিংসা এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কেউই রেহাই পাচ্ছে না, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ এবং এমনকি নারী ও শিশুরাও। বিবাহিত নারীদের ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বাড়িঘর লুট ও পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।” তিনি প্রধান বিচারপতি পলের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চকে আরও জানান যে, তিনি ১৯৯৫ সালে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছিলেন এবং তাঁর সদস্যপদ “নিয়মিতভাবে নবিকরণ” করেছেন।
জনস্বার্থ মামলাটি দায়ের করেন আইনজীবী শীর্ষাণ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি প্রবীণ আইনজীবী এবং তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ কল্যাণ ব্যানার্জীর পুত্র। শুনানির সময়, রাজ্য সরকারের আইনজীবী ধীরাজ ত্রিবেদী আবেদনটির বিরোধিতা করে যুক্তি দেন যে, আবেদনে হিংসার কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ করা হয়নি এবং আদালতের সামনে সুনির্দিষ্ট তথ্য উপস্থাপন না করে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ জারি করা উচিত নয়।
এদিকে, পশ্চিমবঙ্গের নতুন এবং নবম মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, বৃহস্পতিবার বিকেলে তাঁর পূর্বসূরীর কলকাতা হাইকোর্টে উপস্থিত হয়ে আইনজীবী হিসেবে জনস্বার্থ মামলাটির পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের পদক্ষেপের পর সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমার অনেক কাজ জমে আছে। একটি অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে ভাবার সময় আমার নেই। সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ।”