ওঙ্কার ডেস্ক: প্রায় চার দশক ধরে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো এক মাওবাদী নেতার আত্মসমর্পণের ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে দেশের গোয়েন্দা সংস্থা। মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড়, তেলেঙ্গানা ও অন্ধ্রপ্রদেশের জঙ্গলাঞ্চলে রক্তাক্ত হামলার নেপথ্যে থাকা সিপিআই (মাওবাদী)-র শীর্ষ নেতা ভূপতি, অবশেষে আত্মসমর্পণ করেছেন। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর তাঁর এই পদক্ষেপকে মাওবাদী সংগঠনের জন্য বড় ধাক্কা বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
ভূপতি ছিলেন সিপিআই (মাওবাদী)-র কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের সদস্য। অর্থাৎ, সংগঠনের সামরিক কৌশল নির্ধারণে অন্যতম মুখ্য ভূমিকা ছিল তাঁর। একাধিক রাজ্যে তাঁর নামে কোটি টাকার পুরস্কার ঘোষণা করা ছিল। মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড়, ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তেলেঙ্গানায় পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে খুঁজছিল। তাঁর ছদ্মনাম ছিল ‘সোনু’, ‘ভেনু’, ‘মাস্টার’ এই সব নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন মাওবাদী দলে। ভূপতি হলেন প্রয়াত মাওবাদী নেতা কিষেনজির ভাই, যিনি ২০১১ সালে পশ্চিম মেদিনীপুরের বুড়িশাল এলাকায় পুলিশের এনকাউন্টারে নিহত হন। ভূপতির স্ত্রী বিমলা চন্দ্র সিদাম ওরফে তারকাও এর আগেই আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
ভূপতির আত্মসমর্পণের পেছনে দুটি বড় কারণ উঠে এসেছে গোয়েন্দা সূত্রে। প্রথমত, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিভিন্ন রাজ্যে মাওবাদ বিরোধী অভিযানের তীব্রতা এতটাই বেড়েছে যে, ভূপতি কার্যত ঘেরাও হয়ে পড়েছিলেন। মহারাষ্ট্র পুলিশের ‘সি-৬০’ কমান্ডো বাহিনী এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর যৌথ অভিযানে গড়চিরোল থেকে আবুজমাড় পর্যন্ত পুরো এলাকা মাওবাদীদের জন্য বেশ সমস্যার কারন হয়ে ওঠে। সেই সঙ্গে ভূপতির অবস্থান একাধিকবার সনাক্ত হওয়ায় পালানোর রাস্তা ক্রমে সংকীর্ণ হচ্ছিল। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তিনি নিজেই সংগঠনের মধ্যে সহিংসতার পথ পরিত্যাগ করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটির তরফে সেই মতের কড়া বিরোধিতা হয়।
দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ অঞ্চলে মাওবাদী সংগঠনের প্রতি জনসমর্থন দ্রুত হ্রাস পেতে শুরু করেছে। সরকারের পুনর্বাসন কর্মসূচি ও উন্নয়ন প্রকল্প অনেকাংশে আদিবাসী এলাকার মানুষকে মূল ধারায় ফিরিয়ে এনেছে। ফলে, মাওবাদী আন্দোলনের প্রতি ভরসা অনেকটা কমেছে তাঁদের। ভূপতি বুঝতে পেরেছিলেন, অস্ত্র তুলে নিয়ে এই লড়াই আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাঁর স্ত্রী আগেই আত্মসমর্পণ করায় পারিবারিক চাপও তৈরি হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ভূপতির আত্মসমর্পণ শুধু এক জন নেতার পতন নয়, বরং গোটা মাওবাদী কাঠামোর ভেতরে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভাঙনও প্রকাশ করে। দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় ও জঙ্গলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মাওবাদী নেটওয়ার্ক ক্রমে রাষ্ট্রের চাপে দমে আসছে। ভুপতিজির হঠাৎ আত্মসমর্পন মাওবাদী অন্দোলনকে একেবারেই নিস্তেজ করে দিয়েছে।
