বিপ্লব দাশ : কিছুদিন আগে কুইংদাওতে শেষ হল এসসিও শীর্ষ সম্মেলন। যা ভারতের কাছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটা শিক্ষণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। কী কারণে পাকিস্তান সন্ত্রাস মদতে এত সাহস পাচ্ছে তার একটা প্রকৃষ্ট ইংগিত উঠে আসে এই সম্মেলনের অন্যতম ফিট ব্যাক থেকে। প্রসঙ্গটা অবশ্যই পাকিস্তানের সন্ত্রাস সহযোগিতার বিষয়। পহেলগাঁও কাণ্ডের প্রেক্ষাপটে এসসিও-র ঘোষণাপত্রে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নিন্দাবার্তা অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিল ভারত। কিন্তু তা গ্রাহ্য করা হয়নি। সামনে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিও-তে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। এই অসম্পূর্ণ কাজটি এবার করার সবরকম চেষ্টা করবে ভারত। কিন্তু পাকিস্তানের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সরব হতে চাইলেই বাধা কোত্থেকে আসছে তা জানতে গেলে অবশ্যই সামনে এসে পড়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড়দার রহস্যময় ভূমিকা।
এ প্রসঙ্গে অপারেশন সিঁদুরের ঠিক আগেই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের একটা টিভি সাক্ষাৎকার খুবই উল্লেখযোগ্য। একটি ব্রিটিশ টিভি মিডিয়ায় তিনি বলেছিলেন, “আমরা প্রায় তিন দশক ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই নোংরা কাজ করে আসছি…”। ওই স্বাক্ষাৎকারে তিনি গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সন্ত্রাসবাদকে অর্থায়ন এবং সমর্থন করার কথা স্বীকার করে নেন। এখানে আরেকটি কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ, তা হল, পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছিলেন, অভিযান চলাকালীন নূর খান এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিমান ঘাঁটিতে হামলার পর তাঁর দেশ যুদ্ধবিরতির অনুরোধ করেছিল। এর মধ্যেও একটা রহস্য আছে। তা হল মার্কিনি অভিসন্ধি।
এটা পরিষ্কার করতে হলে লেখক ইমতিয়াজ গুলের একটি বক্তব্য তুলে ধরা দরকার। একটি পডকাস্টে তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীকেও ঘাঁটিতে অভিযানে হস্তক্ষেপ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এই প্রসঙ্গে তিনি এও বলেন, একবার যখন একজন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা বারবার জানতে চেয়েছিলেন যে ঘাঁটিতে আমেরিকান বিমান কী পণ্য বহন করে, তখন তাকে বন্দুক তুলে বলা হয়েছিল যে এই বিবরণগুলি জানার অধিকার তাঁর নেই। স্পষ্টতই ইমতিয়াজ গুলের এই কথা রীতিমতো অপ্রস্তুতে ফেলেছিল ইসলামাবাদকে। এই নিয়ে সেইসময় পাকিস্তানে বেশ শোরগোল ওঠে। এই প্রসঙ্গে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) শহীদ আজিজের একটি সাক্ষাৎকারের কথা তুলে ধরা যায়। একটি বেসরকারি চ্যানেলে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে তিনি যা বলেছিলেন তাতে পাকিস্তানের ক্ষমতাধরদের মুখ আরও লাল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তিনি বলেছিলেন, ৯/১১-পরবর্তী সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের সামরিকঘাঁটিগুলো মার্কিন নিয়ন্ত্রণে ছিল। তাঁর দাবি, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি পারভেজ মোশাররফ সেনা কমান্ডারদের বলেছিলেন যে তিনি ইতিমধ্যেই পাকিস্তানি ঘাঁটিতে মার্কিন প্রবেশাধিকারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের প্রতিবাদ সত্ত্বেও এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন হামিদ মীর, যিনি ওসামা বিন লাদেনের শেষ সরকারি সাক্ষাৎকার নিয়ে সারা বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায়, আইএসআই-র প্রধান ব্রিগেডিয়ার মোহাম্মদ ইউসুফ তাঁর ‘দ্য বিয়ার ট্র্যাপ’-এ অপারেশনাল কৌশল এবং সমন্বয় সম্পর্কে লেখাটি। আইএসআই-এর সহযোগিতা নিয়ে ব্রিটেনের মেজর মার্ক অ্যাডকিনের সঙ্গে ইউসুফের যৌথ লেখা ওই বইটি ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয়। যেখানে তিনি লিখেছিলেন, “সর্বদা অন্ধকারে বিমান আসত। সাধারণত রাত ৯.০০ টার দিকে অথবা ভোর হওয়ার ঠিক আগে, জেনারেল আখতার এবং আমি, স্থানীয় সিআইএ কর্মীদের সঙ্গে চাকলালা বিমান ঘাঁটিতে বিশাল কালো সি-১৪১ স্টারলিফটার টার্মিনালের নির্জন অংশে ট্যাক্সি করে পৌঁছানোর জন্য অপেক্ষা করতাম”।
আমেরিকার কাছে পাকিস্তান এমন এক বন্ধু যে গাজরেও আছে, কব্জিতেও আছে। ভৌগোলিকভাবে, পাকিস্তান পশ্চিমে ইরানের সঙ্গে এবং উত্তরে আফগানিস্তানের সঙ্গে তার সীমানা ভাগ করে আছে। রাজনৈতিকভাবে, সরকারগুলি বেশিরভাগই আর্থিক এবং নৈতিকভাবে দেউলিয়া। তাই পাকিস্তান বেশিরভাগ চুক্তির জন্য নমনীয় থাকতে বাধ্য। এটাই কাজে লাগায় আমেরিকা। অপারেশন সিঁদুর যখন পাক সামরিকঘাঁটিগুলিতে হামলা চালাচ্ছিল, তখন কেন আমেরিকা যুদ্ধ থামাতে তৎপর হয়ে পড়েছিল নিশ্চয়ই এবার তা অস্পষ্ট নয় ! এবার নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে, G-7 সম্মেলন ছেড়ে কেন ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানের সেনা প্রধান আসিম মুনিরের অভ্যর্থনার জন্য ওয়াশিংটন চলে এসেছিলেন। এই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত কি পারবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিন্দা নথিভুক্ত করতে ? ব্রিকস্-এ ভারত কোন কূটনৈতিক কৌশল নেয় সেদিকেই তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে !
