ওঙ্কার ডেস্ক : সোমবার লোকসভায় বিশেষ বৈঠকে শুরু হলো ‘বন্দে মাতরম’-এর ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দীর্ঘ বিতর্ক। আলোচনার সূচনা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে গানটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, স্বাধীনতা সংগ্রামে তার ভূমিকা এবং বর্তমান সময়ে গানটিকে নানাভাবে তুলে ধরার পরিকল্পনা। এর মধ্যেই বন্দে মাতরম গানের স্রষ্টা শ্রী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে তিনি ‘বঙ্কিমদা’ বলে সম্মোধন করায় তীব্র সমালোচনার মুখে পরেন। পাশাপাশি বন্দে মাতরম’-এর শতবর্ষপূর্তিতে ইন্দিরা গান্ধির আমলে এমারজেন্সির কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকের শুরুতেই মোদি বলেন, “বন্দে মাতরম কেবল একটি গান নয়, এটি ছিল সংগ্রামের শক্তি। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধেই এই গান মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে”। প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন, ১৯৩৭ সালে গানটির কিছু অংশ বাদ দেওয়া হয়েছিল রাজনৈতিক কারণে। তাঁর অভিযোগ, সেই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে বিভাজনের ভিত্তি তৈরি করেছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “গানের পূর্ণতা ফিরিয়ে আনা আজ ইতিহাসের ঋণ শোধের সময়”।
‘বন্দে মাতরম’-এর ১৫০ বছর পুর্তিতে দেশাত্মবোধক এই গানকে সম্মান দেওয়ার কথা বলেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। সোমবার সংসদে এই বিষয়ে কথা বলার আগেও বিগত কয়েকমাস যাবৎ একাধিকবার ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে সরব হয়েছিলেন্নত্র। ৭ নভেম্বর তিনি সভায় ‘বন্দে মাতরম’-এর মাহাত্ম নিয়ে বক্তৃতা দেন। দেশের স্বাধিনতা সংগ্রামের এই গুরত্বপুর্ণ সংগীতকে সংসদে সম্মান দেওয়ার সময় গানের স্রষ্টা শ্রী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে তিনি ‘বঙ্কিমদা’ বলে সম্বোধন করে বসেন, এবং তিনি একাধিক বার এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেন। এক পর্যায়ে এসে বাংলার সাংসদ সৌগত রায় প্রধানমন্ত্রী মোদীর বক্তব্যকে আপত্তি জানিয়ে শ্রী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে যথাযথ সম্মান দেওয়ার অনুরোধ জানান।
এদিন সংসদে ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে বক্তব্য রাখার সময় তিনি একাধিক বার কংগ্রেস এবং ইন্দিরা গান্ধির শাসনকালে এমারজেন্সির কথা উল্লেখ করেন। তাঁর কথায়, “কংগ্রেস ‘বন্দে মাতরম’-কে ভেঙ্গেছে”। এমনকি নরেন্দ্র মোদী নিজের বক্তৃতায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুকেও নিশানা করেছেন।
এই বিশেষ অধিবেশনটি ১০ ঘণ্টা ধরে চলবে বলে সংসদ সূত্রের খবর। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা আগেই গানটির ১৫০ বছর উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তার মধ্যে রয়েছে বিশেষ স্মারক ডাকটিকিট, স্মারক মুদ্রা এবং দেশজুড়ে সাংস্কৃতিক উদ্যাপন। সংসদে আলোচনা শুরু হওয়ার পরেই বিজেপির সদস্যরা গানটির সম্পূর্ণ পাঠ সংসদ কক্ষে বাজানোর দাবিও তোলেন।
অন্য দিকে বিরোধী শিবিরের একটি অংশ প্রশ্ন তোলে অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য নিয়ে। বিরোধী দলের কয়েকজন সাংসদ বলেন, দেশের বর্তমান সামাজিক কাঠামোতে কোনও ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক উপাদানকে রাজনৈতিকভাবে প্রয়োগ করলে বিভাজনের সম্ভাবনা বাড়ে। তাঁদের বক্তব্য, গানটি অবশ্যই ঐতিহ্যের অংশ, কিন্তু তাকে নতুন করে প্রাসঙ্গিকতা দেওয়ার ক্ষেত্রে সংবেদনশীল হওয়া জরুরি। তৃণমূল, কংগ্রেস ও কিছু আঞ্চলিক দলের সদস্যরা আলোচনায় অংশ নেন এবং গানটির উৎস ও পটভূমি সম্পর্কে নিজেদের মত তুলে ধরেন।
আলোচনায় শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতি বিশারদ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত গবেষকদের বক্তব্যও সংসদে উদ্ধৃত হয়। তাঁদের মতে, বন্দে মাতরম ছিল জাতীয় চেতনাকে একত্র করবার প্রতীক, তবে গানটি রচনার সময়কার প্রেক্ষাপটকে বর্তমান সময়ে সমানভাবে প্রয়োগ করা যায় কিনা তা ভাবনার বিষয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী প্রজন্মকে সেই ইতিহাস জানানো জরুরি। তাঁর দাবি, বছরের পর বছর এই গানকে ঐতিহাসিক মূল্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। এদিন তিনি বলেন, “আজকের ভারত নতুন যুগে পা রেখেছে। আমাদের দায়িত্ব, অতীতের শক্তিগুলোকে ফের সামনে আনা”।
সাংসদদের বক্তব্যের পর সংসদে গানটির বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যবহার নিয়ে প্রস্তাব আনা হয়। আলোচনা চলাকালীন সদস্যদের একাংশ পরামর্শ দেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বন্দে মাতরমের পূর্ণ পাঠের ইতিহাস পড়ানো হোক। অন্যদিকে কিছু বিরোধী সদস্য জানান, তা বাধ্যতামূলক হলে বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
