কুশল চক্রবর্তী : ভারতীয় হিন্দু ঋষি চার্বাক বলেছিলেন, “ ঋণ করে ঘি খাও, যতদিন বাঁচো সুখে বাঁচো”। অন্য আনেক ঋষি মুনির কথা একালের মানুষ না মানলেও বোধহয় এই কথাটা হয়ত মেনে নিয়েছে। কারণ, বিগত কয়েক বছর ধরে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে ধার করে নানা জিনিস কিনে সে টাকা ফেরত দিতে পারছে না অসংখ্য মানুষ। এবং দেখা যাচ্ছে এই যে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে যে টাকা ব্যয় করা হচ্ছে, তা হচ্ছে বেশির ভাগ ভোগ্য পণ্য কেনার জন্যই। বিগত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান বলছে, ক্রেডিট কার্ড দিয়ে জিনিস কিনে তার টাকা ফেরত না দেবার পরিমাণটা ৫০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে ক্রেডিট কার্ড ব্যাবহার করে টাকা ফেরত না দেবার পরিমাণটা ছিল ২৩৪৭৫ কোটি টাকা, সেটা ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ৩৩৮৮৬ কোটি টাকায়। এক বছরেই এই অনাদায়ী ঋণের পরিমান বেড়েছে ৪৪ শতাংশ।
ক্রেডিট কার্ডের মজাটা হচ্ছে এই যে, এটা দিয়ে জিনিস কিনলে বা কোনও রকম খরচ করলে তার স্বপক্ষে কোনও কিছু বন্ধক রাখতে হয় না। অতএব যাঁরা এই টাকাটা গ্রাহককে ঋণ হিসাবে দিচ্ছে, তাদের পক্ষে ঋণ দেওয়া টাকা উদ্ধার করা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। উন্নত অর্থনিতির দেশে ক্রেডিট কার্ড ব্যাবহার করা হয় মুলত নগদ টাকার লেনদেনের বিকল্প হিসাবে। আর আমদের দেশে এটা ব্যাবহার করা হয় মুলত চাহিদা বাড়াবার অন্যতম উপায় হিসাবে।
অতএব অনেক ক্ষেত্রেই ক্রেডিট কার্ড নিতে গ্রাহককে উৎসাহ দেওয়া হয় নানা বিনামূল্যে সুবিধা দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। এগুলোর মধ্যে আছে- ক্রেডিট কার্ড দিয়ে জিনিস কিনলে কিছু টাকা ফেরত দেওয়া, বেড়াতে গেলে কিছু সুবিধা দেওয়া, বিনা মূল্যে বিমান বন্দরের লাউঞ্জে সময় অতিবাহিত করার সুযোগ দেওয়া ইত্যাদি। আজকের দিনে যুব সমাজের কাছে মোবাইল ফোন একটি ভীষণ ইস্পিত বস্তু। এই সব মোবাইল ফোন ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে কিনলে প্রথমে নেওয়া হয় কম দাম, তারপর বিনা সুদে মাসিক কিস্তিত্তে টাকা মিটিয়ে দেবার সুবিধা দেওয়া হয়। তার ফলে বাড়ে মোবাইল ফোনের বিক্রি, কিন্তু ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষ, যাঁরা কিনা নিজের অর্থনৈতিক অবস্থার কথা না ভেবে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে এসব জিনিস কেনে। আর ক্রেডিট কার্ড বিক্রি করা কোম্পানিগুলো দরাজ হস্তে গ্রাহককে ধার দেয়, যাতে কিনা একদিকে তাদের ক্রেডিট কার্ড বেশি ব্যাবহার করে লোকে, অন্যদিকে পণ্য প্রস্তুতকারী সংস্থাদের সঙ্গে রাখে সুসম্পর্ক, তাদের বাবসায়িক স্বার্থ উন্নত করতে।
এখন দেখা যাচ্ছে যে, ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলোর কাছে। ক্রেডিট কার্ড কোম্পানিগুলো ভেবেছিল ৩০ দিন বা ৫০ দিনের পর ধারের টাকা ফেরত না দিলে গ্রাহকের কাছ চড়া সুদে টাকা নিয়ে নিজদের ব্যবসা বাড়াবে কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ধার নিয়ে একবারেই টাকা ফেরত না দেবার প্রবণতা গ্রাহকের দিনের পর দিন বাড়ছে। এতে একদিকে যেমন ক্রেডিট কার্ড সংস্থাগুলোর ব্যবসা চাপের মুখে পড়ছে, অন্য দিকে সরকারকে বাধ্য করছে ক্রেডিট কার্ডের লোণের উপর বিধি নিষেধ আরোপ করতে। আসলে সমাজে চাকরির অভাব, অন্তরলিন বৈষম্য, ভোগবাদী জীবনের প্রভাব- মানুষকে কিছুটা হলেও বিভ্রান্ত করছে। আর সরকার যদি ক্রেডিট কার্ডে দেওয়া ধারের ব্যাপারে কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়, তবে কিন্তু প্রভাব পড়বে পণ্য উৎপাদনের উপরও। আমাদের মত অর্থনৈতিক বৈষম্যের দেশে ক্রেডিট কার্ডের ঢালাও ব্যাবহারের যৌক্তিকতা কতটা তা নিয়ে চিন্তা করার সময় আসেনি কি?
