বিপ্লব দাশ : এই শতকের একদম প্রথম দিকে, সেটা ২০০৬ সালের কথা, ভারতীয় রাজনীতিতে প্রসাদ নিয়ে সে কী তুলকালাম। জাতীয় রাজনীতিতে বিরোধীরা একযোগে তাকে ভারতীয় গণতন্ত্রের হত্যা বলে গলা চড়িয়েছিলেন। তবে তা কোনো দেবতার প্রসাদ ছিল না। তা ছিল রাষ্ট্রীয় জনতা দলের প্রসাদ। পুরো নাম রাজনীতি প্রসাদ। যিনি ছিলেন রাজ্য সভার সদস্য। সেবার সংসদে অধিবেশন চলাকালীন লোকপাল বিলের নথি ছিঁড়ে ওয়েলে ছুঁড়ে ফেলেছিলেন। ঘটনাটি ঘটেছিল তাঁর দলের সুপ্রিমো লালুপ্রসাদ যাদবের সামনেই। গোটা ঘটনাটাই সেবার লালুপ্রসাদ ভিজিটর গ্যালারি থেকে দেখেছিলেন। অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হিসেবে নিশ্চয়ই বুঝেছিলেন, রাজনীতিকদের এবার ধোয়া-তুলসীপাতার দিন শেষ হয়ে আসছে।
সেই প্রসাদ এবার অন্যরূপে ফিরে এলো বাংলার রাজনীতিতে। দিঘার জগন্নাথদেবের প্রসাদের পালটা পুরীর জগন্নাথদেবের প্রসাদ নিয়ে রাজনীতি ময়দানে নামল বিজেপি। বিষয়টা লঘু ভাবে ভাবলে চলবে না। এর শিকড় প্রবেশ করে গেছে বহু গভীরে, পরিকল্পিত ভাবে। যার সূত্রপাত ২০১৯ সালে। বিজেপি তো দূরের কথা, কাকপক্ষীও টের পায়নি এর ভবিষ্যৎ কী হতে চলেছে।
ছ’ বছর পর যখন দিঘায় মাথা তুলে দাঁড়াল সুসজ্জিত জগন্নাথদেবের মন্দির এবং তাকে ঘিরে মানুষের মধ্যে যখন আবেগ ও আগ্রহ চূরান্ত আকার নিল ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। আর এখানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক বিচক্ষণতার কাছে পিছু হটলো সনাতনীদের রাজনৈতিক দুর্বলতা। শুধু তাই নয়, এরপর যখন আধা সরকারি আধা দলীয় ব্যবস্থাপনার মধ্যে তা সারা রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ল, তখন বিজেপির কাছে বিষয়টি কার্যত নাগালের বাইরে। হিন্দুজাগরণবাদীদের সেই দিশেহারা চেহার আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল যখন তারা পুরীর জগন্নাথদেবের প্রসাদ বিতরণ কর্মসূচি নিল। বাংলার এক আঞ্চলিক ধর্মীয় ভাবাবেগ রাজ্যের রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়াল। কিন্তু এটাও কি বিজেপির আরেক অজ্ঞতা নয় ? যে আবেগ একটা স্বত্ত্বাকে মান্যতা দেয়, সেই আবেগ দিয়ে তাকে অমান্য করা যায় না। বরং তা অনুকরণ হয়ে ওঠে। আর অনুকরণ কখনো যুদ্ধের অস্ত্র হতে পারে না। লড়াইয়ের জন্য লাগে স্বকীয়তা।
