পুজো মানেই মায়ের আগমন, আর মায়ের পুজোয় পদ্মফুলের গুরুত্ব যে কতখানি, তা বাঙালিকে নতুন করে বলে দিতে হয় না। কিন্তু ভাবুন তো, পুজোর সময় বাজার থেকে পদ্মফুল কিনে আনার বদলে নিজের বাড়ির ছাদবাগানে ফোটানো টাটকা পদ্মফুল দিয়ে যদি মায়ের পুজো করা যায়, তাহলে কেমন হয়? শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, সঠিক পদ্ধতি জানা থাকলে বাড়ির ছাদেই খুব সহজে পদ্মফুল চাষ করা সম্ভব।
প্রথমেই জেনে নিন, পদ্ম চাষের জন্য কেমন পাত্র দরকার
পদ্মগাছের জন্য সাধারণ ছোট টবের বদলে বড়, চওড়া এবং জল ধরে রাখতে পারে এমন পাত্র বেছে নিন। পাত্রের গভীরতা ও আকার পদ্মের জাত অনুযায়ী ঠিক করা ভালো। পাত্রে যেন কোনও ছিদ্র দিয়ে জল বেরিয়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখবেন। কারণ পদ্ম জলজ উদ্ভিদ, তাই এর শিকড় কাদামাটির মধ্যে থাকবে এবং ওপরের দিকে জল জমে থাকবে।
এবার আসি মাটি তৈরির কথায়
পদ্মগাছের জন্য ভারী দোআঁশ মাটি বা এঁটেল মাটি খুব ভালো। মাটির সঙ্গে সামান্য পচানো জৈব সার মেশানো যেতে পারে। তবে একেবারে কাঁচা গোবর, অপরিণত কম্পোস্ট বা অতিরিক্ত সার ব্যবহার করবেন না। এতে জলে দুর্গন্ধ হতে পারে, শিকড়ের ক্ষতি হতে পারে এবং গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। মাটি পাত্রের মধ্যে এমনভাবে বসিয়ে দিন, যাতে রাইজোম বা কন্দ সহজে শিকড় ছড়াতে পারে।
পদ্মগাছ লাগানোর সঠিক পদ্ধতি কী ?
পদ্ম চাষের জন্য বীজ অথবা সুস্থ রাইজোম ব্যবহার করা যায়। তবে দ্রুত গাছ বড় করে ফুল পাওয়ার উদ্দেশ্য থাকলে উপযুক্ত জাতের সুস্থ রাইজোম দিয়ে শুরু করা সুবিধাজনক হতে পারে। রাইজোম লাগানোর সময় তার বাড়ন্ত ডগাটি যেন ভেঙে না যায়, তা বিশেষভাবে খেয়াল রাখবেন। কন্দকে খুব গভীরে পুঁতে দেবেন না। আলতোভাবে মাটির ওপর বসিয়ে সামান্য মাটি দিয়ে আটকে দিন।
এরপর ধীরে ধীরে জল দিন, যাতে মাটি সরে গিয়ে রাইজোম বেরিয়ে না আসে। গাছের কচি পাতা বেরোতে শুরু করলে প্রয়োজন অনুযায়ী জলের গভীরতা বাড়াবেন।
ছাদে পদ্মফুল ফোটাতে রোদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
পদ্মগাছ প্রচুর রোদ ভালোবাসে। তাই এমন জায়গায় পাত্র রাখুন, যেখানে প্রতিদিন অন্তত ৬–৮ ঘণ্টা সরাসরি রোদ আসে। পর্যাপ্ত রোদ না পেলে পাতা বাড়লেও ফুল কম হতে পারে, এমনকি অনেক সময় ফুল নাও আসতে পারে। বিশেষ করে ছাদের যে অংশে সারাদিন ভালো রোদ পড়ে, পদ্মের পাত্র রাখার জন্য সেই জায়গাটিই বেছে নিন।
তবে মনে রাখবেন, জলভরা বড় পাত্র ছাদে বসানোর আগে ছাদের ভার বহন করার ক্ষমতা যাচাই করে নেবেন। জল, মাটি ও পাত্র মিলিয়ে ওজন অনেক বেড়ে যেতে পারে।
এবার জেনে নিন পদ্মগাছের পরিচর্যার কয়েকটি জরুরি নিয়ম
প্রথমত, পাত্রে পর্যাপ্ত জল বজায় রাখতে হবে। জল খুব কমে গেলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। আবার জল দেওয়ার সময় মাটি যেন ঘোলা হয়ে রাইজোমের ওপর থেকে সরে না যায়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পুরোনো হলুদ পাতা ও শুকিয়ে যাওয়া ফুল পরিষ্কার করে দিন। এতে গাছ পরিষ্কার থাকে এবং অপ্রয়োজনীয় পচন কমে।
তৃতীয়ত, সার দেওয়ার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করুন। পদ্মের জন্য উপযোগী জলজ উদ্ভিদের সার বা নিয়ন্ত্রিত মাত্রার উপযুক্ত সার ব্যবহার করুন। গাছের বৃদ্ধি ও জাত অনুযায়ী সারের পরিমাণ নির্ধারণ করুন। অতিরিক্ত সার দিলে পাতার বৃদ্ধি বেড়ে যেতে পারে, শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং জলের গুণমান নষ্ট হতে পারে।
চতুর্থত, পাত্রে মশার লার্ভা বা পচা জৈব পদার্থ জমছে কি না, নিয়মিত পরীক্ষা করুন। জল পরিষ্কার রাখুন এবং মশার সমস্যা হলে জলজ উদ্ভিদের জন্য নিরাপদ ব্যবস্থা নিন।
তাহলে বেশি বেশি পদ্মফুল পাওয়ার উপায় কী ?
প্রচুর ফুল পাওয়ার জন্য প্রথমেই সঠিক জাত নির্বাচন করতে হবে। আপনার ছাদে টবে চাষের উপযোগী পদ্মের জাত বেছে নিন। এরপর পর্যাপ্ত রোদ, স্বাস্থ্যকর রাইজোম, উপযুক্ত পাত্র, ভারী মাটি এবং নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করুন। গাছকে পর্যাপ্ত সময় দিন। শুধু বেশি সার দিলেই যে বেশি ফুল হবে, এমন ধারণা একেবারেই ঠিক নয়।
সবশেষে বলি, বাড়ির ছাদে একটি পদ্মগাছ শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায় না, আপনার বাগান করার আনন্দও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। একটু যত্ন, সঠিক পদ্ধতি এবং ধৈর্য থাকলে আপনার ছাদবাগানেও ফুটতে পারে সুন্দর পদ্মফুল।