অমিত গোস্বামী
হাসিনাকে ফেরত চেয়ে দিল্লিকে চিঠি পাঠাল ঢাকা ! প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারে হস্তান্তরের আর্জি ইউনূসদের দখলদার সরকারের। লেবু বেশি চটকালে যেমন তেতো হয়, এই অবান্তর আবদার যে ইউনুস সরকারকে খেলো করে দিচ্ছে, এই চেতনা তাদের নেই। অবান্তর কেন বলছি? প্রথমত ইতিহাস ও দ্বিতীয়ত প্রত্যর্পণ চুক্তির ফোঁকর। ভারত আজ অবধি এমন কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে প্রত্যর্পণ করেনি যার নিজ দেশে প্রতিহিংসামূলক শাস্তির সম্ভাবনা আছে। এমনকি বিএনপি’র সালাউদ্দিনকে সেই সময়ের শাসক ও ভারতবন্ধু শেখ হাসিনার হাতেও তুলে দেয়নি ভারত। এবার আসি প্রত্যর্পণ চুক্তির ফোঁকরে। ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে একটি বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। হাসিনার জমানাতেই ওই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু চুক্তিতে স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে, অপরাধটির চরিত্র যদি রাজনৈতিক থাকে, তা হলে প্রত্যর্পণ করা হবে না এবং বিচারের নেপথ্যে যদি সৎ কোনও উদ্দেশ্য না-থাকে, তা হলে ভারত বা বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণ করবে না।
প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে লিখিত কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ গ্রন্থে মান্ডালা তত্ত্বে (Mandal Theory) যে কথাগুলি উল্লেখিত আছে যা হিন্দুত্ববাদী ভারত চিরকালই মেনে চলেছে। এই তত্ত্বের আকর হল “একটি রাষ্ট্রের প্রতিবেশী স্বভাবগতভাবে তার শত্রু, আর সেই প্রতিবেশীর প্রতিবেশী স্বভাবগতভাবে তার বন্ধু। এই তত্ত্বটি একটি ভৌগোলিক ধারণার ওপর ভিত্তি করে গঠিত, যেখানে মনে করা হয় ঘনিষ্ঠতা বা দূরত্বের ভিত্তিতেই সম্পর্ক নির্ধারিত হয়।” এই তত্ত্ব যে আজও কতটা প্রাসঙ্গিক তা ভারত-পাকিস্তান বা ভারত-চিন সম্পর্ক দিয়ে বোঝা যায়। এই শত্রুতা কমানোর জন্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পরে ঐকান্তিক চেষ্টা করেছিলেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফেরার পথে পূর্ব নির্ধারিত না থাকা সত্ত্বেও বিমানবহর নামিয়ে নওয়াজ শরিফের বাসায় চা-পান করে এলেন। তার কিছুদিন পরেই পুলওয়ামা আক্রমণ করল পাকিস্তানীরা। কিছুদিন বাদে গেলেন চিন সফরে। বিভিন্ন ইস্যুতে যথেষ্ঠ সৌজন্য দেখিয়ে মুক্ত বানিজ্য নীতিতে সম্মতি জানালেন। কিছুদিন বাদেই গলওয়ানে চিন-ভারত সীমান্ত সংঘর্ষ হল যা চিনের আগ্রাসী ভূমিদখলের উদ্যোগ ছিল। মান্ডালা তত্ত্ব প্রমাণিত হয়েছিল।
২০১৪ সালে বাংলাদেশের নির্বাচনে নাক গলিয়েছিল কংগ্রেস। বিদেশমন্ত্রী নটবর সিংহের কন্যা সুজাতা সিংহ ঢাকায় গিয়ে এরশাদকে বিরোধী ভূমিকা নিতে রাজী করিয়ে বিএনপিবিহীন নির্বাচনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে গনতান্ত্রিক বৈধতা দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে শক্ত খুঁটির জোর ছিল কংগ্রেস। ইন্দিরা গান্ধী থেকে প্রণব মুখোপাধ্যায় সকলেই শেখ হাসিনার প্রতি অত্যন্ত উদার ছিলেন। নরেন্দ্র মোদি সম্পর্কে বাংলাদেশের প্রথম থেকেই একটা রক্ষণশীল মনোভাব ছিল। কিন্তু মোদি ক্ষমতায় এসেই প্রথম যে সিদ্ধান্ত নিলেন তা হল ভারত কোন প্রতিবেশী দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাবে না এবং সন্ত্রাসবাদকে নির্মূল করবে প্রতিবেশী দেশের সাথে সহযোগিতার মাধ্যমে। শেখ হাসিনা এই জায়গায় ভারতের সাথে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করলেন এবং তাতে খুশি হলেন নরেন্দ্র মোদি। ভারতের উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলিতে সন্ত্রাসবাদীরা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। শুরু হল ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের স্বর্ণযুগ। সুবিধাটা নিলেন শেখ হাসিনা। অন্তত ৩০ টি চুক্তি তিনি ভারতের সাথে করেছেন যেখানে বাংলাদেশ ভারতের সবচেয়ে সুবিধাপ্রাপ্ত দেশে পরিণত হল। আরেকটা সুবিধা তিনি পেলেন তা হল বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের নিস্পৃহ থাকা।
৫ অগাস্ট, ২০২৫ অনেককিছুই পালটে দিল। শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভারতে নিয়ে এলেন তাদের দায়িত্বে কারণ ভারত বিমান পাঠাতে অস্বীকার করেছিল। এ’কথা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী খুব ভালো করে জানতো যে ভারতের নীতি – অতিথি দেবো ভবঃ। কাজেই শেখ হাসিনা ভারতে চিরকালই নিরাপদ থাকবেন। ইউনুস সরকারের দখলদারিত্ব নেওয়ার পরে পায়ে পা বাধিয়ে বিবাদের সূত্রপাত করল। ইস্যু ছিল চিকেন নেক। ইউনুস যে কত বড়ো দেশবিদ্বেষী তার প্রমাণ এই যে পাকিস্তান সংসদে শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশের উন্নয়নকে দৃষ্টান্ত করে আলোচনা হয়েছিল বারবার, আর ইউনুস এসে সেই পাকিস্তানের পদলেহী সারময়তে পরিণত হল যা ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তানের হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়া স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে অবমাননাকর। ভারত ‘চিকেন নেক’ ইস্যুকে পাত্তা না দেওয়ায় ইউনুস চুলকানিতে আক্রান্ত বাংলাদেশ মেতে উঠল হিন্দু নির্যাতনে। হিন্দু নির্যাতন বাংলাদেশিদের চিরকালীন অনুশীলন। সেটা বাড়লো। তাতেও ক্ষান্তি নেই। একদিকে ক্যাঙারু কোর্ট বসিয়ে শেখ হাসিনার বিচার প্রহসন এবং অন্যদিকে পাক প্রভুদের পদলেহনের প্রমাণ হিসেবে বাংলাদেশে আইএসআই’কে ঘাঁটি গাড়ার অনুমোদন দিল ইউনুস। ভারত সরকারিভাবে না জানালেও দিল্লি বিস্ফোরণের সাথে বাংলাদেশের যোগসূত্রের ‘ড্যসিয়ার’ ভারত খলিলুর রহমানের হাতে তুলে দিয়েছে। ‘ড্যসিয়ার’ মানে নির্ভুল প্রমাণপত্র।
তাতে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের চারিত্রিক বসন খুলে উলঙ্গদশা। কাজেই হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ঘ্যানঘ্যানানির সূত্রপাত। নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা করে আরো যতদিন সম্ভব ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা এই ঘ্যানঘ্যানির মূল মতলব। তাতে তাল মেলাচ্ছে কিছু স্বঘোষিত নির্বোধ ও স্বাধীনতা হারানো সংবাদমাধ্যম। কেউ বলছে হাসিনাকে না দিলে চিকেন নেক দখল করব, কেউ বলছে ভারত ভূমিকম্প পাচার করে বাংলাদেশে পাচার করেছে। বাঙালি এত গর্দভ হয় ? শেখ হাসিনার সব কর্মকান্ড যে সমর্থণযোগ্য নয় সেটা স্বীকার করেই বলা ভালো যে শেখ হাসিনাকে ভারত কোন প্রেক্ষিতেই ফেরত দেবে না। শেখ হাসিনা সরে যাওয়ার পরে সব উৎকট উৎপাতের শুরু বাংলাদেশই করেছে। সে তুলো আমদানি বন্ধই হোক, ফ্রি করিডোর বন্ধই হোক, পাকিস্তান থেকে চাল আমদানি করেই হোক, ভারত প্রতিক্রিয়া দেখায় নি। ফ্রি ট্রান্সশিপমেন্ট ও স্থল বন্দর বন্ধ করেছে মাত্র, এখনও বিদ্যুৎ দিচ্ছে, বানিজ্যিক পণ্য যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। কিন্তু ইউনুসের এখনও চট্টগ্রাম বন্দর বিক্রি বাকি, পায়রা বন্দরে বাংলাদেশ সরকারের অংশ বিক্রি বাকি, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বিক্রি বাকি। দ্রুত এগুলি বিক্রি হলেই ইউনুস পগাড়পার হবে। পড়ে থাকতে হবে ছিবড়ে হয়ে যাওয়া বর্তমানকে। তখন তারা নীরদ সি চৌধুরীর লেখা ‘আত্মঘাতী বাঙালি’ পড়বেন ঘরে বসে।
