ওঙ্কার ডেস্ক: ইন্ডিয়া আউট নীতিতে ভর করে ২০২৩ সালে ক্ষমতায় এসেছিলেন মালদ্বীপের বর্তামান প্রেসিডেন্ট মহম্মদ মইজ্জু। এখন তাঁর সুর বদলে ভারত প্রীতির দিকে ঝুঁকছে। মইজ্জুর প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ গ্রহন করার পর এই প্রথম মালদ্বীপ সফরে ভারতের প্রধান মন্ত্রী নেরেন্দ্র মোদী। দেশের দুর্বল অর্থনীতির জন্যই ভারতের সামনে নত হয়েছে মালদ্বীপ সরকার, এমনটাই মনে করছে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহল।
মালদ্বীপের ৬০তম স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দিতে বৃহস্পতিবার দেশটিতে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এর আগে যুক্তরাজ্য সফর শেষ করে সরাসরি মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে পা রাখেন তিনি। বিমানবন্দর থেকে বেরোতেই মোদিকে স্বাগত জানান খোদ মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহামেদ মুইজ্জু। দুই দেশের নেতার হাত মিলিয়ে অভিবাদন বিনিময়ের ছবি ইতিমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে সংবাদমাধ্যমে।
মালদ্বীপের নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারত-বিরোধী স্লোগান ‘ইন্ডিয়া আউট’ আন্দোলনের জেরে দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা অবনতি হলেও এই সফর সেই সম্পর্কের তিক্ততা একটু হলেও কমবে বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক মহল। কূটনৈতিক শিবির বলছে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মজবুত করতে এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী মোদির এই সফরে দুই দেশের মধ্যে ‘কমপ্রেহেনসিভ ইকনমিক অ্যান্ড মেরিটাইম সিকিউরিটি পার্টনারশিপ’-এর অগ্রগতি পর্যালোচনা হবে। পাশাপাশি অবকাঠামো, পর্যটন, মাছ ধরার শিল্প, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, নীতি-নির্ধারণ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে একাধিক সমঝোতা চুক্তি হতে পারে বলে সূত্রের খবর।
এদিন মালদ্বীপে মোদির অভ্যর্থনায় শিশুদের হাতে ভারতের জাতীয় পতাকা ও মোদির ছবি দেখা গিয়েছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে বহু মানুষ ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি তোলেন, যা দুই দেশের খারাপ হওয়া সম্পর্ককে সুষ্ট করছে বলেই ভাবচজেন অনেকে। মালদ্বীপের মতো গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপরাষ্ট্রকে ভারতের কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়। ‘নেবারহুড ফার্স্ট’ নীতি আর ‘ভিশন মহাসাগর’-এর অংশ হিসেবে ভারত এই সম্পর্ককে আরও গভীর করতে চাইছে।
কিন্তু কেন মইজ্জুর হঠাৎ এই ভারত প্রেম সে নিয়ে নানা মত উঠে আসছে রাজনৈতিক মহল থেকে। ২০২৩ সালে মালদ্বীপে নির্বাচনের আগে ইন্ডিয়া আউট স্লোগান তুলে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন মইজ্জু। তারপরই নিজেরদের দেশ থেকে ভারতীয় সেনাকে সরে যেতে আদেশ দিয়েছিলেন। আর তার জেরেই দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকে। পালটা ভারতও নিজের দেশের পর্যটনকে সমর্থন করে মালদ্বীপ বয়কটের ডাক দেয়। তাতে বেশ ক্ষতির মুখে পরতে হয় মালদ্বীপের পর্যটন বিভাগকে।
মালদ্বীপের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক রাজনৈতিক দিক থেকে বেশ তাৎপর্যপুর্ণ। চীন ভারত মহাসাগরে অধিপত্য বিস্তার করতে চায়, সেজন্য মালদ্বীপ সরকারকে হাতে রাখতে পারলে একাজ আরও সহজ হবে তাদের জন্য। অন্যদিকে ভারত কোনোভাবেই চায় না চীনা দখলে যাক ভারত মহাসাগরের বানিজ্য ব্যবস্থাপনা। মালদ্বীপকে নিজের ঝোলায় রাখতে বিশাল পরিমাণ টাকা ধার দিয়েছিল চীন। ঐ বিপুল অর্থ যে চীনকে ফেরত দেওয়ার ক্ষমতা মালদ্বীপের নেই সেই সতর্কবার্তা আগেই দিয়েছিল আইএমএফ। স্বাভাবিক ভাবেই এরপর বেজিং মালদ্বীপের সঙ্গে আর কোনো লেনদেন করতে অগ্রসর হয়নি। এতেই বিপাকে পরে ভারতের দারস্থ হয় মালদ্বীপ প্রাশাসন। ভারত বিগত তিন বছরে ১১৭০ কোটি টাকার সাহায্য করেছে দ্বীপ রাষ্ট্রকে।
২০২৪ এর পর থেকে ভারতের সঙ্গে ভালো বন্ধুত্বের সম্পর্ক বজায় রাখতে মরিয়া মইজ্জু সরকার। গত বছর জুন মাসে প্রথমবার ভারত ভ্রমনে আসেন তিনি। উল্লেখ্য বিগত কয়েক বছর ধরেই মালদ্বীপের যেকোনো প্রেসিডেন্ট তাঁদের প্রথম বিদেশ সফর শুরু করেন ভারত ভ্রমন দিয়েই, কিন্তু মহম্মদ মইজ্জু প্রেসিডেন্ট হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার পর চীনা সফরে গিয়েছিলেন। জুন মাসের পর অক্টোবরে আবার পরিবার সমেত ভারত সফরে আসেন মইজ্জু। ভারতের থেকে আর্থিক সাহায্য পাবার পর দুই দেশের সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে এগিয়ে আসে দুই দেশই। সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে ভারতের সঙ্গে বাকি প্রতিবেশী দেশ গুলির সম্পর্ক খুব একটা মধুর নয়। কাশ্মীরে পর্যটক হামলার পর পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছিল ভারত। শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের জেরে সে দেশের সঙ্গেও সম্পর্ক অবনতি হয়। এ সময় মালদ্বীপকে হাতে রাখতে পারলে ভারতেরই সুবিধা। তাই দিল্লিও মালদ্বীপের বন্ধুত্বের আমন্ত্রন গ্রহণ করতে আগ্রহী।
