কুশল চক্রবর্তী
কী বিচিত্র এই দেশ ! বিজ্ঞাপনে লেখা হচ্ছে এইখানে অর্থ বিনিয়োগে বিপদের ঝুঁকি আছে। বুঝেসুঝে নিয়োগ করুন। কিন্তু বাস্তবে কি হচ্ছে ? যে কোনও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে গেলেই দেখা যাবে ব্যাঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিটের চেয়ে মিউচুয়াল ফান্ডে লগ্নি করার জন্য ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, মিউচুয়াল ফান্ডের লগ্নির অধিকতর লাভজনক গুনাগুন সম্বন্ধে গ্রাহককে অনেক বেশী ওয়াকিবহাল করা হচ্ছে। এমনকি কোন দিন যদি কোনও ব্যাঙ্কের শাখা ভালো অঙ্কের মিউচুয়াল ফাণ্ড বিক্রি করতে পারছে, সেখানে হয়ত দেখা যাচ্ছে সেই ব্যাঙ্কের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের আনাগোনা, এমন কী সন্ধ্যায় বসছে ভুরিভোজের আসর।
কিন্তু গত ৩ নভেম্বর শেয়ার বাজারে দেখা গেল এক অদ্ভুত ঘটনা। এদিন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের শেয়ারগুলোর দাম আনেকখানি পড়ে গেল, কারণ ভারত সরকার ঘোষণা করল যে তারা ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে বিদেশী বিনিয়োগ ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪৯ শতাংশ আপাতত করছে না। হতাশ গ্রাহকেরা মুখ ফিরিয়ে নিল ব্যাঙ্ক অফ বরোদা, ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্ক, পাঞ্জাব ন্যাশানাল ব্যাঙ্ক, কানাড়া ব্যাঙ্ক ও অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শেয়ার থেকে। দাম পড়ল বলতে গেলে সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের শেয়ারের। দেখুন এতে ক্ষতি হল ব্যাঙ্কগুলোর তো বটেই, সঙ্গে মিউচুয়াল ফাণ্ড কিনেছে যারা তাদেরও। কারণ ওই মিউচুয়াল ফাণ্ডগুলোর হয়ত অনেক টাকাই লগ্নি করা ছিল ব্যাঙ্কগুলোর শেয়ার। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শাখায় বসে যে কর্মচারীটি এই মিউচুয়াল ফান্ডের বিক্রির জন্য আন্তরিক ভাবে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন তিনি কি একবারও বুঝতে পারলেন, তার এই কর্তব্য পরায়নতার কি মাশুল তাকে দিতে হতে পারে ?
যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে উনি অনেক কষ্ট করে চাকরি পেয়েছেন, তা একদিন পরিনত হতে পারে একটি বিদেশীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত প্রাইভেট ব্যাঙ্কে। ৪৯ শতাংশ শেয়ার যদি আজ কোনও বিদেশী সংস্থার হাতে চলে যায় তবে তো সে সহজেই যে কোনও ভারতীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে র মালিক হয়ে বসতে পারে, আর মাত্র ২ শতাংশ শেয়ার জোগাড় করে। এটা যেন বস্তুত আমাদের ছোটবেলায় খেলা কাটাকুটির দুই ফাঁদের মতো হল। অর্থাৎ কিনা বিদেশী বিনিয়োগের মাত্রা বাড়লে শেয়ারে দাম বাড়বে আর তার ফলে ব্যাঙ্ক যে মিউচুয়াল ফাণ্ডগুলো লাভজনক হবে বলে গ্রাহকদের বিক্রি করেছে, তার দাম বাড়বে। অতএব ব্যাঙ্কের কথার দাম বাড়বে।
কিন্তু যে কারণে শেয়ারের দাম বাড়বে বা প্রকারান্তরে মিউচুয়াল ফান্ড লাভজনক হয়ে উঠবে, তা হবে একজন ব্যাঙ্ক কর্মচারীর তো বটেই, এমনকি ভারতীয় আপামর জনতার ক্ষতির কারণ হতেই পারে। আজ থেকে তিন দশক আগেও কোনও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের শাখায় বসে অন্য কোনও অর্থনৈতিক জিনিস বিক্রি করা ছিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আর আজ ব্যাঙ্কের প্রতিটি কর্মচারীকে উৎসাহিত করা হচ্ছে মিউচুয়াল ফাণ্ড বা ইন্সুয়ারেন্স বিক্রির জন্য। দেওয়া হচ্ছে তাদের নানা উৎসাহ জনক পারিতোষিক। ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে ভারতের সর্ব বৃহৎ ব্যাঙ্ক, ষ্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, শুধু মিউচুয়াল ফাণ্ড বিক্রি করেই রোজগার করেছে ১০৩৯ কোটি টাকা। তার কিছু অংশ নিশ্চয়ই এসেছে ব্যাঙ্কের নানা শ্রেণীর কর্মচারীদের সন্মাণীর খাতায়। কিন্তু চিন্তা করে একবার দেখুন, এই যে ব্যাঙ্কের ফিক্সড ডিপোসিটের চেয়ে মিউচুয়াল ফাণ্ডকে গুরুত্ব দিয়ে একজন ব্যাঙ্ক কর্মচারী হিসাবে আপনি কি আপনার বা সমাজের প্রতি কালিদাসের মত “বিখ্যাত” কাজ করছেন না ?
