ওঙ্কার ডেস্ক: বিগত প্রায় দুই বছর ধরে অশান্ত বাংলাদেশ। একাধিক অন্তরবর্তী এবং অন্তর্জাতিক কারণে বারে বারে জ্বলে উঠেছে পদ্মাপার। সরকারি রিপোর্ট অনুযায়ী সেখ হাসিনার পদত্যাগের পরও দেশে অস্বাভাবিক এবং রহস্যজনক ভাবে মৃত্যু হয়েছে শতাধিক। দেশের পরিস্থিতি সামান্য স্থিতিশীল হলেও ওসমান হাদির মৃত্যুর পর আবার অবস্থা ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সরকারি তথ্য অনুসারে গত বছরের ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশে ২৭৭ জনের অস্বাভাবিক ভাবে মৃত্যু ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন কতটা শান্তিপুর্ণ ভাবে করা সম্ভব বা আদৌ নির্বাচন হবে কিনা সে নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে চব্বিশ সালের জুলাই বিক্ষোভের সময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে পালানোর পর গত বছর ডিসেম্বরে ফের উতপ্ত হয় পড়শি দেশ। বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচনের দিন ঘোষণা হওয়ার কিছু দিনের মাথায় জুলাই বিক্ষোভের অন্যত্তম মুখ তথা ইনক্লাব মঞ্চের সুপ্রিমো ওসমান হাদির মৃত্যুর আবার চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় দেশ জুড়ে। ঢাকায় নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি চলাকালীন গুলিবিদ্ধ হয়ে তরুণ নেতা শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর বাংলাদেশ জুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছিল। তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ্যে আসতেই রাজধানীসহ একাধিক জেলায় ক্ষোভ, বিক্ষোভ এবং সহিংসতার ঘটনায় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। সাধারণ মানুষের মধ্যে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও ছড়িয়ে পড়ে, যা দ্রুত রাস্তায় নেমে আসে প্রতিবাদে।
ওসমান হাদি সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনী প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছিলেন। হামলার পর গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সমর্থকরা একে পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ তোলেন এবং দ্রুত দোষীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি জানান। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও জেলা শহরগুলোতে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে অবরোধ গড়ে তোলেন। বহু জায়গায় যান চলাচল ব্যাহত হয়, দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একাধিক সহিংস ঘটনার খবর সামনে আসে। কোথাও রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে মারধর, কোথাও গুলির ঘটনা, আবার কোথাও সন্দেহভাজনদের উপর গণপিটুনির মতো নৃশংসতার অভিযোগ উঠেছে। সরকারি ভবন, সংবাদ মাধ্যমের অফিসে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। ময়মনসিংহের দিপু দাসকে মারধরের পর আগুনে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ, সাংবাদিকের গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা এবং বিভিন্ন স্থানে রহস্যজনক মৃত্যুর খবর স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে অশান্তির প্রভাব যে সেদেশের নির্বাচনে পড়বে তা নিশ্চিত যুক্তরাষ্ট্র। তাই বাংলাদেশে থাকা মার্কিন নাগরিকদের নির্বাচনের সময়কালে অতিরিক্ত সাবধানে থাকার পরামর্শ দিয়েছে ঢাকার মার্কিন দুতাবাস দফতর। এছাড়াও বাংলাদেশের নির্বাচন যাতে সুস্থ ভাবে হয় সেকারণে বিশ্বে একাধিক দেশের প্রতিনিধি চেয়ে পাঠিয়েছে বাংলাদেশের অন্তরবর্তী সরকার। এখনও পর্যন্ত ৩৩০ টি প্রতিনিধি নির্বাচন পর্যবেক্ষণে যাবেন তা জানিয়েছে ইউনুস সরকার। ভারতও পদ্মাপারের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের আমন্ত্রন পেলেও এখনও সেটি নিয়ে কোনো সরকারি মন্তব্য করেনি নয়া দিল্লি।
নাগরিক সমাজের একাংশের দাবি, ধারাবাহিক এই সহিংসতা প্রমাণ করছে যে রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে নির্বাচনকে সামনে রেখে এমন অস্থিরতা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও দলীয় সংঘাত সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে। বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন যাতে শান্তিপুর্ণভাবে সম্পন্ন হয় তা নিশ্চিত করতে নির্বাচনের সময়কালে যান বাহন চলাচল, অবাঞ্ছিত জমায়েতের উপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, হাদির হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সহিংসতার ঘটনাগুলির তদন্ত শুরু হয়েছে। জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে এবং গুজবে কান না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
তবে সাধারণ মানুষের একাংশের মতে, শুধু আশ্বাসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। নিরাপত্তা জোরদার করা, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা নিশ্চিত না হলে অশান্তি আরও বাড়তে পারে। হাদির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা এখন দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
