কলকাতার বুকে এক ভীতিকর কাহিনী
নিজস্ব সংবাদদাতা : কিছু ছাত্র বলেছে যে তারা মনোজিত মিশ্রকে এতটাই ভয় পেয়েছিল যে তারা কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ এমনই এক ভীতিকর চরিত্রকে নিয়ে কসবার সাউথ ক্যালকাটা ল’ কলেজের দেওয়ালে লেখা- “মনোজিত দাদা আমাদের হৃদয়ে আছে (টিম এমএম)”। এমন হৃদয়ের “দাদা” এখন ক্যাম্পাসে বর্বরোচিত ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় সারা দেশে সংবাদ শিরোনামে। হ্যাঁ, এই “মনোজিৎ দাদা” এখানে মনোজিৎ মিশ্র। কসবা ল’ কলেজের মধ্যে ওই কলেজের এক ছাত্রীকে ধর্ষণ মামলার প্রধান অভিযুক্ত। এবং সে এমন একজন প্রাক্তন ছাত্র যে প্রাক্তন হয়েও এই ল’ কলেজ ক্যাম্পাসের শাহেনশাহ্।
মনোজিতের প্রোফাইল বলছে, সে ২০১৭ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলের ছাত্র সংগঠন তৃণমূল কলেজ ছাত্র পরিষদের কলেজ ইউনিটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। অথচ ধর্ষণ মামলা নিয়ে দেশব্যাপী ক্ষোভের মধ্যে তৃণমূল দাবি করেছে, তার দলের সঙ্গে এই অভিযুক্তের কোনও সম্পর্কই নেই। এমন কি তৃণমূল তার কঠোরতম শাস্তিও চাইছে। কলেজের ছাত্ররা বলেছে যে মনোজিৎ, যাকে বন্ধুরা “ম্যাঙ্গো” বলে ডাকে, সে ক্যাম্পাসে এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল যে শিক্ষক এবং অফিস কর্মীরাও তাকে ভয় পেতেন। ধর্ষণের ঘটনার পর একে একে বেরিয়ে আসছে বহু কুকীর্তির নজির। অতীতে তার বিরুদ্ধে হয়রানি ও শ্লীলতাহানির একাধিক অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়েছিল, কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কেন নেওয়া হয়নি, ক্ষমতাসীন তৃণমূলের অবশ্য এ বিষয়ে রা নেই।
মনোজিতের বাবা, রবিন মিশ্র, কালীঘাটের একজন পুরোহিত। দীর্ঘদিন ধরে তার মা ভুগছেন স্নায়ুরোগে। বাবা রবিন মিশ্র বলেছেন, ছেলেকে তিনি ভালো শিক্ষা দেওয়ার জন্য অনেক কষ্ট করেছেন কিন্তু রাজনীতিতে জড়িত থাকার কারণে তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। মনোজিতের বচসাধর্মী চরিত্রও এই দূরত্বের আরেক কারণ। মনোজিৎ তাই বছর চারেক ধরে অন্যত্র থাকে। শুধু প্রয়োজনে মাঝে মাঝে বাড়ি আসতো।
প্রতিবেশীরা জানিয়েছে, মনোজিৎ অত্যন্ত অশান্তিকর একটি ছেলে। প্রায়শই মাতাল হয়ে ঝগড়াঝাটি বাধাতো। জানা গেছে, তার একজন বান্ধবী ছিল, যিনি একজন আইনজীবীও। প্রায়শই সে মনোজিতের সঙ্গে দেখা করতে আসতো।
শোনা গেছে, একসময়ে বেশ সম্ভাবনাময় ছাত্র ছিল মনোজিৎ। আইনে ক্যারিয়ার গড়ার জন্য আগ্রহী ছিল। তাই ২০০৭ সালে আইন নিয়ে পড়াশুনো শুরু করে। ২০১২ সাল পর্যন্ত আইন নিয়ে পড়াশুনো চলছিল। ছত্রাবস্থায় সে জড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাস রাজনীতিতে। ২০১১ সালে তৃণমূল বাংলায় ক্ষমতায় আসে। সেসময় মনোজিত তার কোর্স শেষ করার আগেই পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। তারপর ২০১৭ সালে পুনরায় ভর্তি হয়। তার প্রোফাইলে সে নিজেকে “ক্রিমিনাল ল’ইয়ার” বলে পরিচয় দিলেও তার বাবার কথা অনুযায়ী মনোজিৎ আদালতের চেয়ে ক্যাম্পাসে বেশি সময় কাটাতো।
২০১৭ সালে, মনোজিতের বিরুদ্ধে কলেজের অধ্যক্ষের অফিসে ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। তৃণমূল কংগ্রেস তখন কলেজের দলীয় ইউনিট ভেঙে দেয়। তাই মনোজিত আর কোনও পদে ছিলেন না। কিন্তু কলকাতার অন্যান্য কলেজের মতো আইন কলেজেও ২০১৭ সাল থেকে কোনও ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। তাই, বাস্তবে, মনোজিত নিজেকেই নেতা বলে জাহির করে চলতো। অনুগামীদের নিয়ে তার একটি দল ছিল।
মজার বিষয় হল, ২০২৩ সালে, সে অসুস্থ হয়ে পড়ার এক বছর পর মনোজিৎ এই কলেজেই একজন সাধারণ কেরানি কর্মী হিসেবে যোগ দেয়। কলেজ প্রশাসন তাকে নিয়োগ করে। এই কাজের জন্য তার দৈনিক বেতন ছিল ৫০০ টাকা। একজন আইনজীবী কেন এই কাজটি করতে রাজি হল তা নিয়ে যথেষ্ট কৌতূহল রয়েছে। সম্ভবত, এর উত্তর লুকিয়ে আছে ক্যাম্পাসে সে যে প্রভাব প্রতিপত্তি গড়ে তুলেছিল তার প্রতি আসক্তির মধ্যে।
শোনা যাচ্ছে, ক্যাম্পাসে মহিলাদের জন্য মনোজিতের ব্যবহৃত পিক-আপ লাইন ছিল “তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে ?”। ক্যাম্পাস ধর্ষণের শিকার ২৪ বছর বয়সী ওই ছাত্রীর সঙ্গে প্রথম আলাপেও একথাই বলেছিল মনোজিৎ। এমন কি কলেজের ছাত্ররা জানিয়েছে, মনোজিৎ কলেজের মেয়েদের ছবি তুলে তা এডিট করে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোতে ছড়িয়ে দিত। তাই নিয়ে চলতো নানান রঙ্গরসিকতা। কিছু ছাত্র বলেছে, মনোজিতকে তারা এতটাই ভয় পেত যে কলেজে যাওয়াই বন্ধ করে দিয়েছিল। মনোজিত খোলাখুলিভাবে বলত যে তার কিছুই হবে না কারণ দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে।
মনোজিৎ মিশ্রের বিরুদ্ধে একাধিক পুলিশ অভিযোগ রয়েছে। এই মামলাগুলিতে সে জামিনে ছিল। এর মধ্যে কয়েকটি হল :
এক, ২০১৯ সালের জুলাইতে দক্ষিণ কলকাতা আইন কলেজের এক ছাত্রীর পোশাক ছিঁড়ে ফেলা।
দুই, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে বন্ধুর বাড়ি থেকে মিউজিক সিস্টেম, সুগন্ধি, চশমা চুরি করা।
তিন, ২০২২-এর মার্চে সুইনহো লেনে এক মহিলার শ্লীলতাহানি।
চার, ২০১৭-র এপ্রিলে একজন পুরুষকে নির্যাতন করে গ্রেপ্তার করা।
২০২৪ সালের মে মাসে একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে কলেজের একজন প্রহরীকে মারধর এবং কলেজের সম্পত্তির ক্ষতি করার অভিযোগও রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মনোজিৎ মিশ্র ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তার দাবি, এটি সম্মতিতে হয়েছিল। পুলিশ এখন তার হেফাজতের মেয়াদ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে এবং তাদের মামলার যুক্তি উপস্থাপনের জন্য আদালতে অপরাধের তালিকা জমা দিতে পারে।
