তাপস মহাপাত্র
কোনো সুনির্দিষ্ট বিষয়ে কঠোর সমালোচনার মুখেও তিনি বা তাঁর সরকার সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিকদের প্রতি কোনো প্রতিহিংসা পরায়ণ মনোভাব পোষণ করবেন না। মঙ্গলবার নবান্নয় সাংবাদিকদের নিয়ে আয়োজিত সভায় এভাবেই স্পষ্টিকরণ করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, সাংবাদিকরা যেন এমন কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ না করেন যা ন্যায্য সমালোচনার গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় নিরাপত্তার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।
মঙ্গলবার নবান্নয় এই বিশেষ কর্মসূচি থেকে সাংবাদিকদের পেনশন আড়াই হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে দ্বিগুণ অর্থাৎ মাসিক ৫,০০০ টাকা করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকেই এই বর্ধিত পেনশন কার্যকর হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের সময়ে মাত্র ১৫০-১৫৪ জন অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিক আড়াই হাজার টাকা করে সামাজিক সুরক্ষা ভাতা পেতেন। এ বার থেকে অসংগঠিত মাধ্যমে কাজ করা, নিউজ ডেস্কে কর্মরত তথা অ্যাক্রেডিটেশন কার্ডহীন অবসরপ্রাপ্ত সাংবাদিকেরাও নির্দিষ্ট নিয়মে এই ৫,০০০ টাকা পেনশনের আওতায় আসবেন। এর পাশাপাশি দুর্গাপুজো উপলক্ষে দেওয়া সরকারি আর্থিক সহায়তায় জেলা ও কলকাতার মধ্যকার বৈষম্য সম্পূর্ণ বাতিল করা হল। আগে কলকাতার সাংবাদিকেরা ২,০০০ টাকা ও জেলার সাংবাদিকেরা ১,০০০ টাকা পেতেন। এখন থেকে আবেদনকারী সমস্ত সাংবাদিককে সমপরিমাণ ৩,০০০ টাকা করে দেওয়া হবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।

একই সঙ্গে সাংবাদিক ও তাঁর পরিবারকে সর্বভারতীয় স্তরে বিনামূল্যে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসার সুবিধার আওতায় আনতে ‘মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনা’র কার্ড হস্তান্তরের সূচনা করলেন তিনি।আগের সরকারের ‘স্বাস্থ্য সাথী’ প্রকল্পের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, অতীতে কেবল রাজ্যের ১,৭০০টি হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ মিলত। এক্ষেত্রে তাঁর দাবি, নতুন আয়ুষ্মান ভারত ও মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনার আওতায় রাজ্যের ১,৯০০ সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে সুবিধা মিলবে। কেবল রাজ্যেই নয়, অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস, ভেলোরের সিএমসি, মুম্বইয়ের টাটা ক্যানসার হাসপাতাল, চণ্ডীগড় পিজিআই এবং হায়দরাবাদের ড. রেড্ডির মতো সমগ্র ভারতের প্রায় ৩৮,০০০ হাসপাতালে সপরিবারে বিনামূল্যে চিকিৎসা পাবেন সাংবাদিকেরা। এই প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, এর জন্য কোনও রাজনৈতিক বা মন্ত্রী পর্যায়ের সুপারিশের প্রয়োজন হবে না।
রাজ্য সচিবালয় ‘নবান্ন’-তে সাংবাদিকদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আপনারা রাজ্য সরকার এবং আমাকে সমালোচনা করতে পারেন। আমার বক্তব্যের সমালোচনা করার পূর্ণ স্বাধীনতা আপনাদের রয়েছে। এমনকি আমার দলের সমালোচনাও আপনারা করতে পারেন। আমি সেই সমালোচনা বিনম্রভাবে গ্রহণ করব। এর জন্য আমি কখনোই প্রতিহিংসাপরায়ণ হব না।” তবে সংবাদমাধ্যমের কাছে তাঁর আবেদন, জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিবেদনে তারা যেন সংবেদনশীলতা বজায় রাখে।

তিনি বলেন, “আমি এটাও আশা করি যে জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় নিরাপত্তা জড়িত বিষয়গুলোতে সংবাদকর্মীরা সংবেদনশীল থাকবেন।” মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সবার কাছেই জাতীয় স্বার্থ ও দেশ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলার অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, এমন কোনো কাজ করা উচিত নয় যা দেশকে দুর্বল করতে পারে বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। তিনি আরও বলেন, “ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলার ভূমিকা সম্পর্কে আমরা সবাই অবগত। তাই, এমন কোনো কাজ আমাদের করা উচিত নয় যা দেশকে দুর্বল করবে বা অস্থিতিশীলতা তৈরি করবে।”
মুখ্যমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রতি আরও আহ্বান জানান যেন কোনো মন্তব্য বা শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তারা সতর্কতা অবলম্বন করেন, যা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিতে পারে। তাঁর কথায়, বাকস্বাধীনতা একটি মৌলিক নীতি, তবে ধর্মীয় অনুভূতি যাতে অকারণে আঘাতপ্রাপ্ত না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকার ও সংবাদমাধ্যম—উভয়েরই রয়েছে। এ প্রসঙ্গে স্পষ্টিকরণ করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন,, “আমাদের দেশে বাকস্বাধীনতা রয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় অনুভূতি যাতে আঘাতপ্রাপ্ত না হয় সে বিষয়ে সরকারের যেমন দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত, সংবাদকর্মীদেরও তেমনই করা উচিত।” তাঁর দাবি, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে কোনো সম্প্রদায়কেই ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনে বাধা দেয়নি। তাঁর মতে, সরকার কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু নিয়মকানুন ও বিধিমালা প্রবর্তন করেছে।

তিনি বলেন, “কোনো গণমাধ্যমই এমন কোনো উদাহরণ দেখাতে পারবে না যেখানে আমরা কোনো সম্প্রদায়ের মানুষকে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস পালনে বাধা দিয়েছি।” এর আগে, পশ্চিমবঙ্গে ‘ভোক্তা অধিকার সুরক্ষা সপ্তাহ’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় অধিকারী অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল কংগ্রেস—উভয় সরকারের আমলেই রাজ্যের ভোক্তা বিষয়ক দপ্তরটি অবহেলার শিকার হয়েছে। তিনি বলেন, “এই দপ্তরটি সরাসরি জনস্বার্থের সঙ্গে জড়িত। সর্বস্তরে ব্যাপক দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়ায় ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয়ই প্রতারিত হচ্ছিলেন।” তিনি জানান, ভোক্তা স্বার্থ রক্ষায় এই দপ্তরটিকে শক্তিশালী ও আরও কার্যকর করে তুলতে তাঁর সরকার বদ্ধপরিকর।