ওঙ্কার ডেস্কঃ প্রয়াত প্রবীণ রাজনীতিক মুকুল রায়। বঙ্গ রাজনীতির একসময়ের লম্বা রেসের ঘোড়া। মমতার আস্থাভাজন, তৃণমূল দল গড়ার অন্যতম কান্ডারি। তৃণমূলকে চারাগাছ থেকে বৃক্ষ করে তোলার পিছনে রোজকার জল, সার দেওয়ায় মমতার পাশাপাশি মুকুলের অবদান অনস্বীকার্য, তা স্বীকার করেন তৃণমূলের তাবড় তাবড় নেতারা। কিন্তু শেষটায় সবটা ঘেঁটে গেল। দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক অস্থিতিশীলতায় নিঃশব্দে চলে গেলেন মুকুল রায়।
দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। নিউ টাউনের এক বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। রবিবার রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মুকুল রায়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। মুকুলের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ রাজনৈতিক মহল। রাজ্য রাজনীতিতে শোকের ছায়া। এক্স হ্যান্ডেলে তৃণমূলের রাজ্য সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন ‘বঙ্গ রাজনীতিতে একটা যুগের অবসান’। জানা গিয়েছে, মুকুলপুত্রকে ফোনও করেছেন তিনি। এক্স হ্যান্ডেলে শোক প্রকাশ করলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও।
জানা যাচ্ছে, হাসপাতাল থেকে দেহ বাড়িতে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কাঁচড়াপাড়ার ঘটক রোডের বাড়ি থেকে হালিশহর শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানেই শেষকৃত্য হবে তাঁর।
কংগ্রেসের হাত ধরে ছাত্র রাজনীতি থেকে সামনের সারিতে উঠে এসেছিলেন মুকুল। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই কংগ্রেস ছেড়ে চলে আসেন তৃণমূলে। তারপর থেকে নানা ওঠাপড়ার মধ্যে রাজনীতিক কেরিয়ার কাটলেও পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তাঁর অভিভাবকত্বে সাংগঠনিক রাজনীতিতে এগিয়েছে তৃণমূল। মাটি ধরে তীক্ষ্ণ বুদ্ধিতে দলকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। বাম সাম্রাজ্যের পতন থেকে দিল্লিতে মন্ত্রীপদ, তৃণমূল ক্ষমতায় এলে তিনি ছিলেন সেকেন্ড ইন কমান্ড। তাঁর কূটনৈতিক চালের জেরে দলের বিপুল সাফল্যে বঙ্গ রাজনীতিতে চাণক্য উপাধি দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। সেই ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে ত্রিপুরা, অসম-সহ উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতেও ঘাসফুল বীজ বপন করে। কিন্তু ২০১৭ এর পর সব ঘেঁটে যায়।
২০১৭ সালের অক্টোবরে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদপদ থেকে ইস্তফা দেন মুকুল। নভেম্বরে দিল্লিতে গিয়ে যোগ দেন বিজেপিতে। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোট এবং ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে বাংলায় ভালো ফল করে বিজেপি। অনেকেই বলেছিলেন, বাংলায় বিজেপির সাফল্যে মুকুলের মস্তিক রয়েছে। তবে যে অভিপ্রায় নিয়ে মুকুল পদ্মশিবিরে গিয়েছিলেন, সেই অভিপ্রায় কাজে আসেনি। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ২০২১ সালে তৃতীয়বারের জন্য বাংলায় ক্ষমতায় আসে তৃণমূল। বিজেপির সঙ্গে মুকুলের রাজনীতির ‘মৌলিক’ পার্থক্য ছিল। আর মুকুল বিজেপিতে সে ভাবে মানিয়েও নিতে পারছিলেন না বলেই মনে করেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
২০২১ সালের ভোটের ফলঘোষণা হয়েছিল মে মাসে। আর জুন মাসে মমতার উপস্থিতিতে তৃণমূলে ফেরেন মুকুল। ঘটনাচক্রে, তাঁর গলায় প্রত্যাবর্তনের উত্তরীয়টি পরিয়ে দেন অভিষেক। মুকুলের ‘সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক’ পদে তিনিই বসেছেন।
ঘর ওয়াপাসি হলেও তৃণমূলে পুরনো জায়গা আর ফিরে পাননি। চাণক্য তকমাও ফিকে হতে থাকে। বিধানসভার ‘পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি’র চেয়ারম্যান করা হলেও কিছু দিনের মধ্যেই পদত্যাগ করেছিলেন। স্ত্রী কৃষ্ণা রায়ের মৃত্যুতে আরও ভেঙে পড়েন তিনি। তার পর থেকেই তাঁর কথাবার্তায় অসংলগ্নতা দেখা যেতে থাকে। মাঝে এক বার নিজেই দিল্লি চলে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, বিজেপিতে ফিরতে চান। কিন্তু তেমন কিছু হয়নি। তারপর শারীরিক অসুস্থতার কারণে কাচরাপাড়ার বাড়ি থেকে আর বেরোতেন না। ডায়াবিটিস, ডিমেনশিয়া, ঘরবন্দী অবস্থা, এভাবেই শেষ অধ্যায় শেষ হল একসময়ের দাপুটে তৃণমূল লিডার তথা বঙ্গ রাজনীতির চাণক্য মুকুল রায়ের।
