তাপস মহাপাত্র
রাজ্যের এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের বদলির সুযোগ করে দিতে বৃহস্পতিবার বিধানসভায় একটি বিশেষ বিল পেশ করে রাজ্য সরকার। ভোটাভুটিতে সেই বিল ১৭১টি পক্ষে এবং ১৫ টি বিপক্ষে ভোটে পাশ হয়। এরপর বিধানসভায় দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই বিলটিকে ‘গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয়’ এবং এর পাস হওয়াকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে মন্তব্য করেছেন। যদিও এই বিলের বিরুদ্ধে তীব্র মত প্রকাশ করেছেন শিক্ষক ও শিক্ষাবিদরা। তাঁরা সতর্ক করে দিয়েছেন, এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ক্ষুণ্ণ হতে পারে এবং শিক্ষার মানও হ্রাস পেতে পারে।
গত ৮ সেপ্টেম্বর রাজ্য মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর, বিধানসভার এক বিশেষ অধিবেশনে উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিস অ্যান্ড কলেজেস (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড রেগুলেশন) (অ্যামেন্ডমেন্ড) বিল ২০২৬ বা ‘পশ্চিমবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ (প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধনী বিল, ২০২৬’ পেশ করেন। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই বিলের মাধ্যমে চলে আসা ২০১৭ সালের আইনের ১৪এ ধারায় একটি নতুন বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের বদলি করার ক্ষমতা সরকারের হাতে আসবে।
বিলটি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। প্রবীণ শিক্ষাবিদদের আশঙ্কা, আইনটি কার্যকর হলে সরকার নিজের ইচ্ছামতো এমন শিক্ষকদের বদলি করতে পারবে, যাঁরা কোনো নির্দিষ্ট ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় সুনাম অর্জন করেছেন এবং যাঁরা ক্ষমতাসীন ব্যবস্থার সমালোচক হিসেবে পরিচিত।
সরকারি কলেজের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে যাঁরা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিযুক্ত হন তাঁদের এক কলেজ থেকে অন্য কলেজে বদলি হওয়া একটি সাধারণ বিষয়। কিন্তু বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য নয়। যদিও এদিন বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, “যদি বিলটি পছন্দ না হয়, তবে চাকরি ছেড়ে দিন।”
রাজ্য সরকার এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে সাম্প্রতিক টানাপড়েনের প্রেক্ষাপটে যে এই বিলটি আনা হয়েছে তার ইঙ্গিত দিয়েছেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী। সরকারের যুক্তি, ঝাড়গ্রাম ও কোচবিহারের মতো জায়গায় সদ্য প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক পরিকাঠামো শক্তিশালী করতে এবং সেগুলোকে উৎকর্ষের কেন্দ্রে বা সেন্টার অফ এক্সিলেন্সতে পরিণত করতে অভিজ্ঞ অধ্যাপকদের সেখানে বদলি করা যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, “বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞ অধ্যাপক নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যাবেন। পরিকাঠামো কেমন হওয়া উচিত, কীভাবে ক্লাস পরিচালনা করা যায় এবং কীভাবে সেগুলোকে উৎকর্ষের কেন্দ্রে পরিণত করা যায়—এসব বিষয়ে তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পথ দেখাবেন।”
তবে শিক্ষক সংগঠন ও শিক্ষাবিদরা এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের মতে, বাধ্যতামূলক বদলি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনকে ক্ষুণ্ণ করতে পারে এবং বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দিতে পারে। এক্ষেত্রে শিক্ষকদের একাংশ জানিয়েছেন, “তৃণমূল সরকার যেসব নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছে, সেগুলোর অবস্থা নিয়ে সরকার যদি সত্যিই আন্তরিক হয়, তবে তাদের উচিত পরিকাঠামোগত উন্নয়নে বিনিয়োগ করা।”
তবে এই নয়া বিলে বিশেষ কিছু পরিবর্তন করা হয়নি বলে দাবি করেছেন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। তিনি জানিয়েছেন, প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক আদানপ্রদান হয়ে আসছে। এ দেশের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতেও বিশেষ পরিস্থিতিতে তা হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীও জানিয়েছিলেন, কর্নাটক, কেরলম, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্রে এই নীতি প্রচলিত। ফলে সমগ্র দেশের নিরিখে এই বিলে নতুন কিছু করা হচ্ছে না বলে তাঁদের দাবি।
এ দিনের অধিবেশনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তৃণমূলের কালিয়াগঞ্জের বিধায়ক আলিফা আহমেদ, আইএসএফ-এর ভাঙড়ের বিধায়ক নওসাদ সিদ্দিকি এবং ডোমকলের সিপিএম বিধায়ক মোস্তাফিজুর রহমানেরা এই বিল নিয়ে বার বার সংশয় প্রকাশ করেন। তাঁদের প্রশ্ন, এই বিল নিয়ে এত তাড়া কেন ? তার উত্তর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেছেন, “সমঝদারের জন্য ইশারাই কাফি।”