ওঙ্কার ডেস্ক: কলকাতায় ওঙ্কার বাংলার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হল ‘পাওয়ারিং বেঙ্গল ২০২৬ বিজনেস কনক্লেভ অ্যান্ড বিজনেস এক্সেলেন্স অ্যাওয়ার্ডস’। ওঙ্কার গ্রুপের উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বাংলার শিল্প, উদ্যোগ, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, সামাজিক উন্নয়ন, নগরোন্নয়ন, শিক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা ব্যক্তিত্বদের সম্মানিত করা হয়। ৮ অগস্ট সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কস কলকাতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, শিল্পপতি, উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিবিদ, সমাজকর্মী এবং সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নগরোন্নয়ন ও পুর বিষয়ক দফতরের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। স্বাগত ভাষণে তিনি নিজের উদ্যোক্তা হিসেবে পথচলার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। সীমিত সুযোগ ও সামান্য পরিসর থেকে কীভাবে উদ্যোগ শুরু করা যায়, সেই অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তিনি নেতৃত্বের ক্ষেত্রে মহিলাদের ভূমিকার গুরুত্বের কথাও উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, সঠিক নেতৃত্ব এবং উদ্যোগী মানসিকতা থাকলে মহিলারাও ব্যবসা ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারেন। বিগত পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে বাংলার শিল্প-খরাকে দূর করতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে আহ্বান জানান মন্ত্রী। তিনি আশ্বাস দেন রাজ্য সরকার বাংলার সার্বিক উন্নয়নের জন্য সব সময় তাঁদের পাশে থাকবে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ওঙ্কার গ্রুপের চেয়ারম্যান প্রহ্লাদ রায় গোয়েঙ্কা, পিয়ারলেস হোটেলসের ম্যানেজিং ডিরেক্টর দেবশ্রী রায় সরকার, আইআইএসইআর কলকাতার রাইস ফাউনডেশের-এর প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ড. সোনালি রায়, ইনফিনিটি গ্রুপের সিএমডি রবীন্দ্র চামারিয়া, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কস কলকাতার ডিরেক্টর মঞ্জিত নায়ক, রঞ্জিয়া ডিজিটালের সিইও কৌশিক ভট্টাচার্য-সহ শিল্প ও প্রযুক্তি জগতের একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক অর্কপ্রভ সরকার এবং অরূপ কালীও।
‘পাওয়ারিং বেঙ্গল ২০২৬’-এর অন্যতম আকর্ষণ ছিল বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য বিশেষ সম্মাননা প্রদান। জীবনব্যাপী কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ‘লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয় তিন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে। কনভেয়ার অ্যান্ড রোপওয়ে সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান শেখর চক্রবর্তী, সিশির রাডারের প্রতিষ্ঠাতা ড. তপন মিশ্র এবং স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ড. নন্দন গুপ্ত এই সম্মান পান। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও একাধিক উদ্যোক্তাকে সম্মানিত করা হয়। রিজন অ্যানালেটিক্স সফটটেক প্রাইভেট লিমিটেড এর সিইও বিপ্লব জানা ‘বেস্ট ইনোভেশন ইন হেলথকেয়ার অ্যাওয়ার্ড’ পান। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনার প্রয়োগের স্বীকৃতি হিসেবেই এই পুরস্কার দেওয়া হয়। অন্যদিকে প্রাইম ইনফোসার্ভ-এর সিইও সুশোভন মুখোপাধ্যায় পান ‘এক্সেলেন্স ইন টেকনোলজি এন্ট্রাপ্রেনারশিপ অ্যাওয়ার্ড’। বাংলার দীর্ঘ ব্যবসায়িক ঐতিহ্যকেও অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। ১২১ বছর ধরে জৈব-বিয়োজ্য প্রাকৃতিক তন্তু দিয়ে সামগ্রী তৈরির ঐতিহ্য বজায় রাখার জন্য অভীক কর, শশীভূষণ কর ও গ্র্যান্ডসন্সকে বিশেষ স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

সামাজিক উদ্যোগের ক্ষেত্রেও একাধিক ব্যক্তিত্বকে সম্মান জানানো হয়। বাঁচবো হিলিং টাচ্ ফাউন্ডেশন -এর প্রতিষ্ঠাতা ড. ধীরেশ চৌধুরী ‘বেস্ট সোশ্যাল এন্ট্রাপ্রেনার অ্যাওয়ার্ড’ পান। সামাজিক কল্যাণের সঙ্গে উদ্যোক্তা ভাবনাকে যুক্ত করে কাজ করার জন্য তাঁকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। একইভাবে বেঙ্গল রিহ্যাবিলিটেশন গ্রপের প্রতিষ্ঠাতা সুপর্ণ দাস ‘স্টার্ট-আপ অব দ্য ইয়ার ইন রিহ্যাবিলিটেশন’ সম্মানে ভূষিত হন। নগরোন্নয়ন ও স্থাপত্যের ক্ষেত্রেও কৃতিত্বের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। স্থপতি অয়ন সেনকে ‘বেস্ট ইন আরবান ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়। অন্যদিকে স্পাইস্ অ্যান্ড সস-এর ডিরেক্টর চন্দা চক্রবর্তী পান ‘বেস্ট উইমেন ওন্ট্রাপ্রেনর অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার। বাংলার ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে মহিলা উদ্যোক্তাদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার প্রতিফলন হিসেবেও এই সম্মানকে দেখা হচ্ছে। বঙ্গের মুক্তো-গয়না শিল্পের ক্ষেত্রেও বিশেষ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। চন্দ্রানী পার্লস্-এর ডিরেক্টর লক্ষ্মী নায়ারকে বাংলার প্রথম মুক্তোর গয়নার ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার জন্য বিশেষ সম্মান দেওয়া হয়। পাশাপাশি রেমেসিস-এর ডিরেক্টর ড. অরিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ও অর্পিতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেওয়া হয় ‘দ্য পাওয়ার কাপল অ্যাওয়ার্ড’। আদিবাসী সমাজ ও কৃষিভিত্তিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও অনুষ্ঠানে গুরুত্ব দেওয়া হয়। আদিবাসী সৈনিক কৃষি বিকাশ শিল্প কেন্দ্র-এর প্রতিষ্ঠাতা সৌমেন কোলে ‘সোশ্যাল ওয়ার্কার অব দ্য ইয়ার’ সম্মানে ভূষিত হন। তিনি তাঁর কাজের মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়ন ও প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে যুক্ত উদ্যোগগুলির গুরুত্বও তুলে ধরেন।

‘পাওয়ারিং বেঙ্গল ২০২৬’-এর মাধ্যমে একদিকে যেমন বাংলার পুরনো শিল্প ও ব্যবসায়িক ঐতিহ্যকে সম্মান জানানো হয়েছে, তেমনই নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ এবং সামাজিক ব্যবসার সম্ভাবনাকেও তুলে ধরা হয়েছিল। আয়োজকদের বক্তব্য, বাংলায় শিল্প ও উদ্যোগের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং নতুন ব্যবসায়িক মডেলকে যুক্ত করা গেলে রাজ্যের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করা সম্ভব। অনুষ্ঠানের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স ক্ষেত্র। বাংলার এই ক্ষেত্রগুলির সম্ভাবনা কীভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে আরও শক্তিশালী করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়। শিল্পমহল, প্রযুক্তি ক্ষেত্র, সরকার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে।