তাপস মহাপাত্র
২,০০০ টাকার বেশি মূল্যের ইউপিআই লেনদেনের ক্ষেত্রে ‘মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট’ বা মার্চেন্ট চার্জ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির যৌথ প্যানেল। এই প্যানেলে রয়েছে ব্যাংক, পেমেন্ট পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থা এবং বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং বাজারের সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলোকে বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া-র নেতৃত্বে গঠিত ‘ইউপিআই অ্যান্ড সার্ভিসেস স্টিয়ারিং কমিটি’-তে ২২ জন সদস্য রয়েছেন। যার মধ্যে ইন্ডিয়ান ব্যাংকস অ্যাসোসিয়েশন এবং পেমেন্টস কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়াও রয়েছে।
সরকারের এখন পর্যন্ত যা নির্দেশ, তাতে কোনো ব্যক্তি মার্চেন্টকে করা ২,০০০ টাকা পর্যন্ত ইউপিআই লেনদেন এবং রুপে ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে করা পেমেন্ট সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকবে। এছাড়া ব্যক্তি-থেকে-ব্যক্তি ইউপিআই লেনদেনের ক্ষেত্রেও বিনামূল্য বজায় থাকবে।
১৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি গেজেট বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, রুপে ডেবিট কার্ড বা ইউপিআই-এর মাধ্যমে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত পেমেন্ট করা বা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে কোনো ব্যাঙ্ক বা সিস্টেম প্রদানকারী সংস্থা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো চার্জ বা মাশুল আরোপ করতে পারবে না।
তবে, ওই বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি যে ২,০০০ টাকার বেশি মূল্যের ইউপিআই লেনদেনের ক্ষেত্রে মার্চেন্টদের কোনো চার্জ দিতে হবে কি না। উল্লেখ্য, এখন পর্যন্ত ইউপিআই লেনদেনের ক্ষেত্রে টাকার পরিমাণ যা-ই হোক না কেন, কোনো চার্জ ধার্য করা হয়নি।
এবার উচ্চ মূল্যের মার্চেন্ট পেমেন্টের ক্ষেত্রে এমডিআর নির্ধারণ করবে প্যানেল। ‘পেমেন্ট অ্যান্ড সেটলমেন্ট সিস্টেমস অ্যাক্ট, ২০০৭’-এর ১০এ ধারায় সংশোধনী আনার পরই এই বিজ্ঞপ্তিটি জারি করা হয়েছে। এই সংশোধনীটি ইউপিআই এবং অন্যান্য নির্দেশিত ইলেকট্রনিক পেমেন্ট পদ্ধতির মাধ্যমে করা পেমেন্টের ওপর এমডিআর আরোপের জন্য একটি আইনি সহায়তা দেয়। সংশোধনী বিলটি সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনে পাস হয়েছিল, যা ১৩ আগস্ট, ২০২৬-এ শেষ হয়। বিলটি পাস হওয়ার পর সরকার জানিয়েছিল, এমডিআর-এর হার নির্ধারণের বিষয়টি ‘ইউপিআই অ্যান্ড সার্ভিসেস স্টিয়ারিং কমিটি’র ওপর ন্যস্ত থাকবে।
জানা গেছে, স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং বাজারের সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করে ২,০০০ টাকার বেশি মূল্যের ইউপিআই লেনদেনের ক্ষেত্রে এমডিআর বা মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট নিয়ে কমিটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তুলনামূলকভাবে, ব্রাজিলের ‘পিক্স’ ব্যবস্থায় মার্চেন্ট চার্জের হার প্রায় ০.৩৩ শতাংশ এবং চিনে তা প্রায় ০.৪০ শতাংশ।
চার্জ বা ফি চালু করার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সরকার জানিয়েছে, লেনদেনের পরিমাণ ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় সাইবার নিরাপত্তা, জালিয়াতি প্রতিরোধ এবং পরিকাঠামোগত উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ও ধারাবাহিক বিনিয়োগের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সরকার আরও বলেছে, বাজারের সম্প্রসারণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য এই চার্জ প্রয়োজন। পাশাপাশি আরও বেশি কোম্পানিকে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণে উৎসাহিত করতে বাজারে প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। সরকার দেখাতে চেয়েছে, প্রবৃদ্ধির পরবর্তী ধাপের জন্য কেবল ভর্তুকির ওপর নির্ভর করা চলে না; বরং ইউপিআই ব্যবস্থাকে শক্তিশালী, সর্বজনীন এবং ভবিষ্যতের উপযোগী করে গড়ে তুলতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো প্রয়োজন।
এর আগে অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন জানিয়েছিলেন, গ্রাহকদের জন্য ইউপিআই পেমেন্ট বা লেনদেন বিনামূল্যে থাকবে এবং ভবিষ্যতে কোনো চার্জ আরোপ করা হলে তা কেবল নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির মার্চেন্ট লেনদেনের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। তিনি আরও বলেছিলেন, “সাধারণ ও কম মূল্যের লেনদেনসহ অধিকাংশ মার্চেন্ট লেনদেনই বিনামূল্যে থাকবে। ভবিষ্যতে এমডিআর আরোপ করা হলে তা কেবল নির্ধারিত সীমার বা থ্রেশহোল্ড-এর ওপরের নির্দিষ্ট কিছু মার্চেন্ট লেনদেনের ক্ষেত্রেই কার্যকর হবে।”
সীতারমন আরও বলেছিলেন, ভারতের ইউপিআই হল বিশ্বের বৃহত্তম রিয়েল-টাইম পেমেন্ট ব্যবস্থা। শুধুমাত্র ২০২৬ সালের জুলাই মাসেই দেশটি ২৯.৯ লক্ষ কোটি টাকা মূল্যের ২,৩৬৬ কোটি ইউপিআই লেনদেন করেছে। যদিও, সরকারের সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তিটি ইতিমধ্যে রাজনৈতিক ময়দানে শোরগোল তুলেছে। কংগ্রেসের অভিযোগ, এর মাধ্যমে গোপনে ইউপিআই লেনদেনের ওপর ফি বা মাশুল আরোপের পথ প্রশস্ত করা হয়েছে।
ইউপিআই পরিচালনা করে এনপিসিআই। যা রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া এবং ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্কস অ্যাসোসিয়েশনের একটি যৌথ উদ্যোগ। এটি ব্যক্তি-পর্যায়ে তাৎক্ষণিক অর্থ আদান-প্রদান বা পেমেন্ট সহজতর করে এবং গ্রাহকদের সরাসরি ব্যবসায়ীদের কাছে অর্থ দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। ২০১৬ সালের ২৫ আগস্ট চালু হওয়ার পর থেকে ইউপিআই ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনেছে। এর লেনদেনের পরিমাণ ২০১৭ অর্থবছরের ০.০৭ লক্ষ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৬ অর্থবছরে প্রায় ৩১৪ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। যা গত এক দশকে ৪,০০০ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমানে ১১টি দেশে ইউপিআই পরিষেবা চালু রয়েছে, যার মধ্যে সর্বশেষ সংযোজন হল উজবেকিস্তান। অন্য দেশগুলো হল- সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ফ্রান্স, মরিশাস, নেপাল, ভুটান, কাতার, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া এবং গ্রিস।