ওঙ্কার ডেস্ক: তামিলনাড়ুর তিরুভাল্লুর জেলার একটি সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কারখানায় ভয়াবহ অ্যামোনিয়া গ্যাস লিকের ঘটনায় মৃত্যু ও অসুস্থতার জেরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। রবিবার সকালে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনায় অন্তত সাতজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। পাশাপাশি ৪০ জনেরও বেশি শ্রমিক গুরুতর অসুস্থ হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চল জুড়ে উদ্বেগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, জেলার কান্নিগাইপাইর এলাকায় অবস্থিত একটি বেসরকারি সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও রফতানিকারক সংস্থার কারখানায় প্রতিদিনের মতো কাজ চলছিল। সেই সময় হঠাৎ করেই কারখানার একটি শীতলীকরণ ইউনিট থেকে অ্যামোনিয়া গ্যাস বেরোতে শুরু করে বলে অভিযোগ। মুহূর্তের মধ্যে গ্যাস কারখানার বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। গ্যাসের তীব্র প্রভাবে শ্রমিকদের চোখে জ্বালা, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা ও বমিভাব দেখা দেয়। অনেকেই কাজের জায়গাতেই অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং কয়েকজন মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠায় কারখানার অন্যান্য কর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ, দমকল এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর সদস্যরা। অসুস্থ শ্রমিকদের দ্রুত উদ্ধার করে নিকটবর্তী বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা শুরু করলেও কয়েকজনকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। পরে মৃতের সংখ্যা বেড়ে সাতজনে পৌঁছায় বলে প্রশাসনিক সূত্রে খবর। ঘটনার পর কারখানা চত্বরে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে উদ্ধারকারী দল। গ্যাসের প্রভাব আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞদের একটি দল নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা শুরু করেছে। একই সঙ্গে কারখানার কর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রাথমিক তদন্তে মনে করা হচ্ছে, কারখানার কোল্ড স্টোরেজ বা শীতলীকরণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কোনও পাইপলাইন বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অ্যামোনিয়া গ্যাস লিক হয়ে থাকতে পারে। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে বিস্তারিত তদন্ত শুরু হয়েছে। শিল্প নিরাপত্তা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিভিন্ন দফতরের আধিকারিকরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। কারখানার নিরাপত্তা মান বজায় রাখা হয়েছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অ্যামোনিয়া একটি অত্যন্ত তীব্র গন্ধযুক্ত এবং বিষাক্ত গ্যাস। অধিক মাত্রায় এই গ্যাস শরীরে প্রবেশ করলে শ্বাসযন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। দীর্ঘ সময় সংস্পর্শে থাকলে প্রাণহানির আশঙ্কাও থাকে। ফলে এই ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠানে অ্যামোনিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তা বিধি মেনে চলার নির্দেশ থাকে। তা সত্ত্বেও এমন দুর্ঘটনা ঘটায় কারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
ঘটনার পর শ্রমিক সংগঠনগুলিও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাঁদের অভিযোগ, অনেক শিল্প কারখানায় নিরাপত্তা সংক্রান্ত নিয়মকানুন কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তা যথাযথভাবে মানা হয় না। শ্রমিকদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম ও জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মৃতদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসার সমস্ত ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, তার জন্যও পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ভারতে শিল্প কারখানায় গ্যাস লিকের ঘটনা নতুন নয়। ১৯৮৪ সালের ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডি আজও দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ শিল্প বিপর্যয় হিসেবে স্মরণ করা হয়। যেই দুর্ঘটনায় তৎকালীন সময়ে ৩০০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে পরবর্তী বছর গুলিতেও প্রায় আরও ১৫০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তামিলনাড়ুর এই দুর্ঘটনার মাত্রা ভোপালের তুলনায় অনেক ছোট হলেও, বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণের ঘটনা ফের একবার শিল্পাঞ্চলগুলিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এমন ঘটনা রুখতে নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শন, আধুনিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং শ্রমিকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।