তাপস মহাপাত্র
গত বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন জাপানের নিহোন হিডানকিও। এই স্বীকৃতি তিনি পেয়েছিলেন তাঁর অভূতপূর্ব মানব কল্যাণকর কাজের জন্য। যিনি ১৯৪৫ সালে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মার্কিন পরমাণু বোমা হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া অসংখ্য দুর্বিসহ ও মরোন্মুখ মানুষের কল্যাণের জন নিরলস আন্দোলন চালিয়েছিলেন। তাঁকে নোবেল পুরস্কারের যোগ্য মুখ হিসেবে সরব হতে হয়নি, দোরে দোরে ঘুরে বেড়াননি। বরং ৬৯ বছর বয়সেও তাঁর লড়াই নিয়েই মগ্ন ছিলেন।
অথচ ২০২৫-এ শান্তি ক্যাটাগরিতে নোবেল পাওয়ার জন্য দুনিয়া দাপিয়ে বেড়াতে দেখা গেল ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। বিভিন্ন দেশে গিয়ে তিনি যে যোগ্য এটা ফলাও করে বলতে শোনা গেল। তা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি শুরু হল। প্রতিহিংসা মূলক আচরণও দেখা গেল। অনেকে বলছেন, যেহেতু নরেন্দ্র মোদীর তরফে এ বিষয়ে কোনো উচ্চবাচ্য মেলেনি তাই ভারতের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। যদিও গুটিকয় পরনির্ভর দেশ তাঁর জন্য কার্যত ঢাকঢোল নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছিলেন। শুক্রবার ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রপন্থী কর্মী মারিয়া করিনা মাচাদোকে মনোনিত করায় ট্রাম্পের আশায় জল ঢাললো নোবেল কমিটি।
এই ঘোষণার পর নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান জর্গেন ওয়াটনে ফ্রাইডনেস অবশ্য শান্তি পুরস্কার সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনোই পুরস্কারের দৌড়ে ছিলেন না।
আমি মনে করি এই কমিটি সব ধরণের প্রচার প্রপাগাণ্ডা এবং মিডিয়ার মনোযোগ দেখেছে। আমরা প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের চিঠি পাই যাঁরা বলেন যে তাঁদের কাজকর্ম কী আলোচিত হতে পারে। কিন্তু এই কমিটি এমন একটি ঘরে বসে পুরস্কার বিচার করে যেখানে সমস্ত বিজয়ীর প্রতিকৃতি রয়েছে। সেই ঘরটি সাহস এবং সততায় পূর্ণ। তাই, আমরা শুধুমাত্র আলফ্রেড নোবেলের কাজ এবং ইচ্ছার উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিই।” এই কথায় স্পষ্ট যে নোবেল কমিটি ২০২৫ সালে মাচাদোকে “একটি গুরুত্বপূর্ণ, ঐক্যবদ্ধ ব্যক্তিত্ব” হিসেবে বর্ণনা করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নয়।
তবে এই নিয়ে ট্রাম্প এবং হোয়াইট হাউস যে ধরণের প্রচারে নেমেছিল তাকে অনেকেই ‘লজ্জাজনক’ বলে মনে করেছেন। কারণ ট্রাম্প নিজেকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জগ্য প্রমাণ করতে গিয়ে যে ভাবে মার্কিন প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে ছিলেন এমন নজির অতীতে দেখা যায়নি। মে মাসে পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘর্ষ বিরতির জন্য ট্রাম্প যেভাবে নিজেকে ত্রাতা হিসেবে জাহির করছিলেন তা খারিজ করে দিয়েছে ভারত। ট্রাম্পের নোবেল শান্তি পুরস্কারের মূল ভিত্তি – ইসরায়েল ও ইরান, রুয়ান্ডা ও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গো, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান, মিশর ও ইথিওপিয়া এবং সার্বিয়া ও কসোভোর মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের দাবি। যা তিনি দৃপ্ত কন্ঠে বলে বেড়িয়েছেন। গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির পরও তাঁকে বলতে শোনা গেল, “আমি ৭টি যুদ্ধ মীমাংসা করেছি, এটি ৮ নম্বর”। এর মধ্যে অবশ্য তিনি ইউক্রেন যুদ্ধ ধরেননি। যদিও গত বছর ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ করবেন। নয় মাস পরে, সেই প্রতিশ্রুতির অবশ্য কোনও লক্ষণ নেই।
ইজরায়েল ও ইরান এবং গাজায় মধ্যে শান্তি ফেরাতে আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে যুদ্ধ পরিস্থিতিই ছিল না। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, রুয়ান্ডা এবং ডিআর কঙ্গোর মধ্যে অশান্তি এখনও থামেনি। তবুও ট্রাম্প প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর বিশাল ‘জয়’ বলে দাবি করে চলেছেন। এমন কি, তাঁর পূর্বসূরি ওবামার নোবেল প্রাইজ পাওয়া নিয়েও সমালোচনা করতে ছাড়েননি। যা তাঁর লোভ ও ঈর্ষাকেই স্পষ্ট করেছে।
