তাপস মহাপাত্র
এও এক সমাজ, সে যতই বন্য হোক না কেন। কিছুকিছু ক্ষেত্রে মিলে যায় মনুষ্য সমাজের রকমসকম। এমনই এক দৃশ্য রণথম্ভোর জঙ্গলে। যেখানে এলাকা দখলের ধুন্ধুমার কাণ্ড দেখা গেল মা বাঘের সঙ্গে নিজের মেয়ে বাঘের। বনকর্তারাও স্বীকার করেছেন, এমন দখলদারির লড়াই হামেশাই দেখা যায় বনেজঙ্গলে। বাঘের সমাজে এমনটা ঘটে থাকে যখন তাদের শাবকরা বড় হয়। যত হলে তাদেরও বসবাসযোগ্য এলাকা চাই। সেটা তো মায়েরই দায়, যতহলে সন্তানের জন্মদাত্রী তারা। নাহয় স্কুল নেই, মল রেস্টুরেন্ট নেই, পুজোয় জামাকাপড় কিনে দিতে হয় না। তাই বলে কি বাঘেদের জীবন নেই ? তা হয় নাকি ! তাদেরও স্বাদ আহ্লাদ আছে, নিজস্ব এলাকার দরকার আছে।

মঙ্গলবার রণথম্ভোরের পর্যটকরা এমনই এক বিরলদৃশ্যের সাক্ষী রইল। বিস্ফারিত চোখে তাঁরা দেখলেন, কী ভাবে বাঘিনী ঋদ্ধি তার মেয়ে মীরার সঙ্গে সংরক্ষিত অঞ্চলে এলাকা দখল নিয়ে তুমুল সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। জঙ্গলে ঘোরার সময় এমন দৃশ্য সত্যি বিরল এবং অস্বাভাবিকও।
সকালেই মা মেয়েকে কাছাকাছি দেখা গিয়েছিল। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল বেশ খোশ মেজাজে রয়েছে তারা। কিন্তু ভূমি শুধু মানুষের নয়, তার অধিকারের জন্য বন্যরাও কুরুক্ষেত্র বাধাত পারে তা ঋদ্ধি ও মীরাকে না দেখলে বোঝা যেত না। হয়তো ঝগড়াটা দীর্ঘদিন ধরে ছিল, কিন্তু তা এদিন যেন তান্ডবের রূপ নেয়। মেয়ে মীরা তার অঞ্চল দাবি করে ঋদ্ধিকে চ্যালেঞ্জ জানায়। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তা রণক্ষেত্রের রূপ নেয়। মেয়ের ওই চ্যালেঞ্জ হিংসাত্মক লড়াইয়ে পরিণত হয়। ওরা দুই বাঘ তো নয়, যেন কুরু পাণ্ডব। তাদের গর্জনে প্রতিধ্বনিত হয় গোটা জঙ্গল। সেই যুদ্ধ সংক্ষিপ্ত ছিল, কিন্তু তীব্রতা ছাপিয়ে গিয়েছিল হিংস্রতার শৃঙ্গ। অবশেষে মা ঋদ্ধি জয়ী হয়। মীরা হাল ছেড়ে ফিরে যায় গভীর জঙ্গলে। যদিও ওই যুদ্ধে ঋদ্ধি ও মীরা উভয়েই আহত হয়। বনকর্তারাই জানিয়েছিলেন, এটি একটি আঞ্চলিক লড়াই। বন্যপ্রাণীদের আচরণে একটি স্বাভাবিক বিষয়।

ঋদ্ধির তিনটি শাবক বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা মায়ের কাছ থেকে আলাদা হয়ে যে যার নিজস্ব বাসস্থান পেতে চায়। তার জন্য চাই নিজস্ব অঞ্চল। বাঘেরা কখনও দানখয়রাত করে না। নিজেদের প্রয়োজন বুঝে নিতে হয় লড়াই করে। তাই এমন সংঘর্ষ হামেশাই ঘটে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখন একটি শাবক তার নিজস্ব এলাকা দাবি করার চেষ্টা করে, তখন তার প্রথম চ্যালেঞ্জ সাধারণত মায়ের সঙ্গেই হয়।
রণথম্ভোর জাতীয় উদ্যান থেকে জানা গেছে, ওই বাঘিনী ঋদ্ধি বিশিষ্ট বাঘিনী মাচালির পঞ্চম প্রজন্ম। সে টাইগ্রেস অ্যারোহেডের কন্যা। যে তার প্রপিতামহীর মতোই শক্তিশালী এবং চিত্তাকর্ষক। ঋদ্ধি এখন তার মায়ের এলাকার মধ্যে নিজস্ব এলাকা তৈরি করেছে। তার বিচরণ এখন জোন ৩ এবং ৪-এর পদম হ্রদ, রাজ-বাগ, মালিক হ্রদ এবং মান্দুব এলাকা জুড়ে। ঠিক
এই অঞ্চলটিই রণথম্ভোরের প্রাণকেন্দ্র। যেখানে প্রভাবশালী বাঘিনীর উত্তরাধিকার শুরু হয়েছিল মাচালি দিয়ে, তার পরে তার মেয়ে সুন্দরী, তারপর কৃষ্ণা, তীরের মাথা এবং এখন ঋদ্ধি। বংশপরম্পরায় এরা এখনও মাচালির ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।
